অঘোষিত অভিশাপ

১!!

_ ভালোবেসে বিয়েটা আজ করেই নিলাম দুই পরিবারের অনুমতি নিয়ে। আমার গরীব বাবার পক্ষে যতটুকু আয়োজন করা সম্ভব তার কোন ত্রুটি রাখেন নি উনি। ছেলে ব্যাংকের ম্যানেজার,  উচ্চশিক্ষিত,  ধনী পরিবারের একমাত্র সন্তান। তার বাসা সিরাজগঞ্জে আর আমার রাজশাহী তে।  বিয়ের পর আমার বর ফাহিম আমার হাত ধরে বলে,

•             “ স্নিগ্ধা,  আমার বাসা তো সিরাজগঞ্জে,  আর এখন তো অনেক রাত ও হয়ে গিয়েছে।  আজ বরং তোমাদের বাড়িতেই রাত কাটায়।  আমরা না হয় কিছুদিন পর তোমাকে আমাদের বাড়ি নিয়ে যাবো।  ”

•             “ তুমি যা ভালো বোঝো, তাই করো।  ”

•             “ বলছিলাম যে এভাবে এতো গয়না পড়ে থাকার তো কোন মানে হয়না।  ওগুলো খুলে দিয়ে দাও,  আম্মা যত্ন করে উনার কাছে রেখে দিবেন।  যখন তোমার দরকার হবে আবার চেয়ে নিবে।  ”

খুব অবাক হয়ে যায়,  আমার গয়না আমার বাবা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আমাকে বানিয়ে দিয়েছেন।  আর আমি তা দিয়ে দিবো! তাও দিয়ে দিই, কারণ সে আমার স্বামী। খুব ভালোবেসে বিয়ে করেছি,  বিশ্বাস করি নিজের চেয়েও বেশী। 

সব গয়না মিলিয়ে ২ ভরি স্বর্ণ হবে,  এটা আমার মুরগী ব্যবসায়ী বাবার কাছে এক পাহাড় সমান টাকা।  তবুও কবিরকে সব দিয়ে দিলাম।  কবির সব গয়না ওর মায়ের হাতে তুলে দেয়।  বর পক্ষের সবাই চলে যায়,  কবির আর আমি আমার ঘরেই একে অপরের কাছাকাছি যাই।  আমার কাছে আমার স্বামী, আমার স্বর্গ।  খুব ভালোবেসে একাকার হয়ে গিয়েছিলাম দুইজনে। 

২!!

কবির চলে গেলো পরেরদিন চাকুরীর জন্য,  যাওয়ার আগে বলে গেলো,

•             “ স্নিগ্ধা,  আমি শীঘ্রই ফিরে আসবো,  একদম কান্নাকাটি করবেনা।  নিজের খেয়াল রাখবে,  চেহারার যত্ন নিবে।  তোমার তো ভার্সিটি যেতে হয়,  তাই তোমাকে এখন নিয়্র যাচ্ছিনা। কিছুদিন পর এসে তোমাকে নিয়ে যাবো।  ”

কবিরকে জড়িয়ে ধরে খুব কেঁদেছিলাম,  ওকে ছাড়তে ইচ্ছে করছিলো না।  কেনো জানি মনে হচ্ছিলো আমি ওকে হারিয়ে ফেলছি চিরতরে।  তবুও ওকে বিশ্বাস করে যেতে দিলাম,  কবির ও তো আমাকে ভালোবাসে।  অবশ্যই আমাকে নিয়ে যাবে সে। 

দুইদিন সে প্রতিটি কাজে আমাকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করতো,  অনেক মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে আমার মন ভরিয়ে রাখতো।  ওর সাথে কথা বলতে বলতে আমি খুব হাসতাম।  যেনো পৃথিবীর সেরা সুখী মেয়ে ছিলাম আমি। 

৩!!

কবিরকে যতবারই বলেছি আমাকে নিয়ে যাও,  কিভাবে যেনো কথাটা এড়িয়ে যায়।  নিয়ে যাবার কথা বললেই অন্য প্রসঙ্গে কথা বলা শুরু করে।  আমারও তো মন আছে,  স্বপ্ন আছে,  বিয়ের পর নতুন বাড়িতে যাবো,  নতুন করে স্বপ্ন সাজাবো,  সবাইকে নিয়ে সংসার করবো।

আজও কবিরকে ফোন দিলাম, কবির রিসিভ করতেই জিজ্ঞেস করি,

•             “ প্লিজ কবির,  আজ আর না করোনা!  আমাকে তোমার কাছে নিয়ে চলো,  আমি সংসার করতে চাই।  ”

কবিরের গলার সুর যেনো চেঞ্জ হয়ে গেলো,

•             “ সংসার সাজাতে কতো খরচ হয় জানো! কি দিয়েছে তোমার বাবা তোমাকে? যে সবসময় সংসার সংসার করে আমার মাথা খাচ্ছো! যদি সংসার করার এতো ই ইচ্ছে থাকে তাহলে তোমার বাবাকে বলো আমার নামে একটা ফ্লাট আর ফার্নিচার করে দিতে!  তবেই তুমি আমার সাথে সংসার করতে পারবে!”

আজ আমার মাথার উপর যেনো আকাশ ভেঙে পড়েছে!  মাথার মধ্যে যেনো বজ্রপাত হচ্ছে! মাথাটা ঘুরে পড়ে যাই,  পাশের চৌকির কর্ণারে লেগে কপালে একটু কেটে যায়।  সত্যিই বোধহয় আমার কপাল টাই খারাপ ।  আমি আবারো কবিরকে ফোন দিইই,

•             “ কবির প্লিজ! আমাদের তো এমন কোন শর্ত ছিলো না।  তোমাকে তো আমার বাবা এতো কিছু দেওয়ার সামর্থ্য রাখেনা।  এমন করোনা দেখো! আমার পড়ার আর মাত্র একবছর আছে! পড়া শেষ করেই চাকুরী পাবো।  তখন দেখো আমাদের কোন অসুবিধা হবেনা! ”

•             “ এই তোর এতো কিসের কথা! তুই যদি এক মাসের মধ্যে ফ্লাট ফার্নিচার না দিতে পারিস তাহলে তোকে ডিভোর্স দিবো।  তোর মতো নিম্ন ঘরের মেয়েকে বিয়ে করে পরিবারের সামনে মুখ দেখাতে পারছিনা!  সবাই বলছে এই ফকির ঘরের মেয়ে তোকে যাদু করেছে।  আমার একটা স্ট্যাটাস আছে,  তোর জন্য তা তো নষ্ট করতে পারিনা।  ”

•             “ তাহলে বিয়ে করেছিলে কেনো?  কেনো বিয়ের রাতে কাছে টেনে নিলে?  কেনো আমার গয়না নিয়ে গেলে? ”

কোন উত্তর না দিয়েই ফোন অফ করে দেয়। 

৪!!

আমি ওর সাথে ফেসবুকে ও যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি,  কিন্তু সে আমাকে ব্লক করে দিয়েছে।  না পাচ্ছি ফোন দিয়ে।  আমার মনের মধ্যে এক প্রকার জেদ চেপে বসে,  আমি ওর ব্যাংক এই যাবো।  পরেরদিন সকালের বাসে সিরাজগঞ্জ যাই,  ওর অফিসের ঠিকানা জানতাম ।  ওর অফিসে যাই গুগল ম্যাপ দেখে রাস্তা চিনে।  দারোয়ান কে জিজ্ঞেস করতেই দারোয়ান বললো,

•             “ কবির ভাই তো আজকে আসেনি,  উনার তো আজ ছেলে হইছে। বউকে নিয়ে হসপিটাল গেছে! ”

•             “ কবির বিবাহিত! ”

•             “ জ্বী ম্যাডাম,  উনার আগে একটা মেয়েও আছে। ”

এতো টা জঘন্য একটা লোক কিভাবে হয়।  একটা বাচ্চা রেখে বউ প্রেগন্যান্ট অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করে।  এখন আবার বউকে অস্বীকার করে।  সহ্য হলোনা কিছুই আর,  অফিসের সব স্টাফ কে দেখালাম বিয়ের রেজিট্রি পেপার। অফিসে হাঙ্গামার কথা শুনে কবির ছুটে আসে।  এসেই আমাকে চড় মারে, আর বলে,

•             “ তোর সাহস হয় কিভাবে বাজারের মেয়ে কোথাকার!  আমার অফিসে এসে আমাকে মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছিস। ”

•             “ তোমাকে আমি ছাড়বো না কবির! ”

ওর অফিস থেকে বেরিয়ে পাশের পুলিশ স্টেশন এ যাই,  ওখানে তারা বলে রেজিস্ট্রি তো জাল! আল্লাহ আমার সাথে এতো বড় ধোঁকা কেনো কপালে লিখে রাখলো? বাসায় এসে দরজা বন্ধ করে হাউমাউ করে কাঁদলাম।  নিজেকে একদম নিঃসঙ্গ করে নিই এই পৃথিবী থেকে ।

৫!!

পাড়া প্রতিবেশী সবাই কান ঝালাপালা করে দিচ্ছে,  শ্বশুরবাড়িতে কবে যাবো!  আমি কিছুই বলতে পারিনা।  না আমার বাবা মায়ের কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি না বন্ধু বান্ধবীদের, না আত্মীয় স্বজনের।  সবার কাছে আমি যেনো তামাশার পাত্রী হয়ে গিয়েছি।

দুইটা মাস পার হয়ে যাচ্ছে,  শুধু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ  পড়ে কেঁদেছি।  কবিরকে কখনো অভিশাপ দিইনি।  ওকে যে অনেক ভালোবাসতাম।  ওর ক্ষতি তো আর চাইতে পারিনা।  ভার্সিটি যাই, ক্লাস করি,  পড়াশোনার মাঝে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করি।  দুইটা টিউশনি করি হাত খরচের জন্য।  কিছু সামাজিক ভাবে পাওয়া মানসিক অত্যা

চার আমাকে বেশি কষ্ট দিচ্ছে। 

আমার খুব বমি আর মাথা ঘোরা শুরু হয়, ।  আমার বাবা মা কেউ হসপিটালে নিয়ে যায়নি।  কারণ আমার বিয়ে দিতেই উনারা ফকির হয়ে গেছে,  এখন অসুস্থতার চিকিৎসা করার মতো টাকা নেই তাদের কাছে। 

আমার বেষ্ট ফ্রেন্ড নিলা আমার  কথা শুনে আমাকে নিয়ে হসপিটাল এ যায়,  কিছু টেস্ট করায়।  টেষ্টের রেজাল্ট জানতে পারি আমি মা হতে চলেছি।  আল্লাহ আর কত শাস্তি দিবে আমাকে!  আমি নিজেই সমাজের কাছে পরিবারের কাছে বোঝা । আমার সন্তানের দায়িত্ব কিভাবে নিবো?  আমি বাধ্য হয়ে কবিরকে আবারোও ফোন দিই নতুন একটা নাম্বার থেকে।

•             “ কবির আমি স্নিগ্ধা,  কথা না শুনে ফোন কাটিও না প্লিজ!

•             “ কি বলবি বল! ”

•             “ আমি মা হতে চলেছি,  তোমার সন্তান আমার গর্ভে।  আমাকে আর অস্বীকার করিওনা।  নইলে যে আমার মরা ছাড়া আর কোনো রাস্তা নেই।  ”

•             “ তাহলে মরে যা! দেশের দুইটা জনগণ কমে যাবে। ”

ওর কথা শেষ করে ফোন কেটে দেয়,  আমার মধ্যে জেদ চেপে যায়।  এর শেষ কোথায়!  আল্লাহ যেনো আমাকে দেখায়। 

৬!!

প্রেগন্যান্ট অবস্থায় দুইটা টিউশনি চালিয়ে গেছি,  সাথে পড়াশোনা।  ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হবার কয়েকদিনের মধ্যেই লেবার পেইন উঠে।  অনেক কষ্ট,  অনেক পেইন সহ্য করে বাসাতেই নরমাল ডেলিভারীর ব্যবস্থা করে আমার মা।  হসপিটাল এ নেয়নি কারণ আমার বাবার টাকা নেই।  আমার একটা ছেলে হয়, ছেলের কান্না শুনার পর জ্ঞান হারায়।  এতো কষ্টের ফল আমার ছেলে,  ওকে নিয়েই আমাকে টিকে থাকতে হবে প্রতিকূল পরিবেশে।  যতো অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে হবে ওকে পাশে নিয়ে। 

আমার রেজাল্ট এর সময় আমার ছেলের বয়স চার মাস। রেজাল্টের পরপরই আমার বান্ধবীর সাহায্যে ঢাকাতে চাকুরী পেয়ে যায়।  আম্মাকে অনেক কষ্টে রাজি করায় আমার ছেলেকে দেখাশোনা করার জন্য।  প্রথম মাস টা জমানো টাকায় কষ্ট করে চালাই।  পরের মাস থেকে একটা ভালো অঙ্কের বেতন পেয়ে আমাদের তিন জনের ভালোই চলছিলো।  সাথে আমার  বাবাকেও ডেকে নিই। 

রাতে খুব কান্না করছিলাম কারণ আজ আমার বিয়ের বয়স এক বছর।  আমার এতো চোখের জল আল্লাহ ছাড়া কেউ দেখেনি।  তাহাজ্জুদ এর নামাজ পড়ে দোয়া করি,  শুকরিয়া আদায় করি।  এতো কষ্টের পর একটু হলেও সুখে মুখ দেখতে পেয়েছি এটাই আমার কাছে অনেক। 

৭!!

অফিসের ব্রেকে ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিয়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলাম।  ফোন আসছে বারবার ,  বাধ্য হয়ে রিসিভ করলাম।  ওইপাশ থেকে একটা মেয়ের কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। 

•             “ আরে কে আপনি? এভাবে কাঁদছেন কেনো?”

•             “ আমি কবিরের স্ত্রী সোফিয়া,  বলেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন।  ”

•             “ আরে আপনি কাঁদছেন কেনো?”  বলে ধড়ফড় করে উঠে বসলাম।

•             “ আমার স্বামী আর বেঁচে নেই বোন!  ক্ষমা করে দিস আমাকে।  ”

•             “ কি বলছেন এইসব? কিসের ক্ষমা!  ”

•             “  আমি পাপ করেছি রে বোন,  আমার স্বামীর কাছে আবদার করেছিলাম,  গাড়ি আমার লাগবেই।  যেভাবে পারো আমাকে গাড়ি কিনে দাও।  আমি পুরো শহর ঘুরে বেড়াবো সেই গাড়িতে চড়ে। কবিরের গাড়ি কেনার জন্য কিছু টাকার ঘাটতি ছিলো।  সেটা পূরণ করতেই তোকে বিয়ে করে,  এরপর তোর কাছে নেওয়া সোনার গয়নার বিনিময়ে টাকা তোলে।  এতো ছলচাতুরি করে কেনা গাড়িতে কাল আমরা কক্সবাজার যাচ্ছিলাম।  ঢাকা – চিটাগং রোডে যাত্রাবাড়ীতে  একটা এক্সিডেন্ট হয়।  আমি আর আমার ছেলে পেছনে ছিলাম, আমার স্বামী আর মেয়ে সামনে ছিলো।  দুইজনে ট্রাকের নিচে পিষে গেছে।  আমার ছেলের শুধু পা ভেঙে গেছে আর আমার ডান হাত। আমি অন্যায় করেছি তার শাস্তি পেয়েছি। তোর অভিশাপ তুলে নে রে বোন, নইলে যে আমার ছেলেটাও মরে যাবে।    ”

আমি তো কোন অভিশাপ দিই নি।  আল্লাহ তাহলে আমার সাথে অবিচার এর শাস্তি দিলেন।  আমি কি সত্যিই খুশি হতে পারছি!  ছুটে যাই ঢাকা মেডিকেল মর্গে,  আমার ছেলের পিতাকে শেষ বারের মতো দেখতে।  শুধু মনে মনে এটুকুই বললাম,  “ একটা নিরীহ মেয়েকে ঠকিয়ে কয়দিন সুখ পেলে কবির?  আমি তো ভালোই আছি,  আমার সন্তান কে নিয়ে।  তুমি বলেছিলে আমার মৃত্যুতে দুইজন মানুষ কমবে,  অথচ দেখো!  দুইজন মানুষ সত্যিই কমে গেলো। ”

দুইদিনের দুনিয়াতে যত ইচ্ছে পাপ করছে সবাই,  সব পাপের বিচার পৃথিবী তে না হলেও আল্লাহর দরবারে অবশ্যই হবে।

আরো পড়ুন: ইলিশের কাঁটা