ছোট মুখে বড়ো কথা… গোস্তাকি মাফ জাঁহাপনা

ছোট মুখে বড়ো কথা বলতে চাইছি বলে আগেভাগেই মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি সবার কাছে। প্রথম কথা- আমি লেখক নই। নই রাজনীতিবিদ কিংবা রাজনৈতিক ভাষ্যকার। এরপরেও- দেশের একজন সামান্য নাগরিক হিসেবে সুনির্দিষ্ট একটি প্রসঙ্গ নিয়ে আমার পর্যবেক্ষণটুকুই বিনয়ের সাথে এখানে তুলে ধরতে চাইছি মাত্র। ভুলত্রুটি মার্জনীয়!

গত ২৬ অক্টোবর (২০১৯) শনিবার, প্রথম আলোতে সোহরাব হাসানের লেখা উপসম্পাদকীয়টি পড়ে বেশ চমৎকৃত হলাম। এই নামকরা পত্রিকাটি খুব সহজে বর্তমান সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা করতে চান বলে আমার মনে হয়নি খুব একটা (অবশ্য আমার পর্যবেক্ষণ ভুলও হতে পারে)। কিন্তু প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি- সোহরাব হাসানের লেখা “লি কুয়ান, শেখ হাসিনা ও শুদ্ধি অভিযান” শীর্ষক এই উপসম্পাদকীয়টি পড়ে ভিন্নরকম একটি অনুভূতি পেলাম। যেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শুদ্ধি অভিযানের প্রশংসা এবং কিছু প্রত্যাশাই মূল প্রতিপাদ্য।

কবি ও লেখক-সাংবাদিক সোহরাব হাসান আমার অগ্রজপ্রতীম বন্ধু মানুষ। ওই বন্ধুত্বটুকুই একমাত্র ভরসা। নইলে উনার মত ডাকসাইটে একজন রাজনৈতিক ভাষ্যকারের লেখা পুঁজি করে কোনকিছু বলা আমার শক্তি-সাহসের বাইরে। সুতরাং, মার্জনা আগেই চেয়ে রেখেছি। তবে, ‘আমার ভালোলাগা’ এমন একটি লেখার জন্য সোহরাব ভাইকে অভিনন্দন।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চলমান “শুদ্ধি অভিযান” নিয়েই আবর্তিত হয়েছে উল্লেখিত লেখাটি। লেখক, চলমান শুদ্ধি অভিযানকে প্রশংসার চোখেই দেখছেন, প্রধানত। “শোভন রাব্বানি” থেকে সেই শনিবারের আগেরদিন (যেদিন লেখাটি প্রকাশিত হল) পর্যন্ত পরিচালিত সকল অভিযানগুলো সবিস্তারে উল্লেখ করেই তিনি নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করেছেন, বেশক’টি রেফারেন্স সহকারে। উনার লেখাটির সাথে একাত্মতা রেখেই আমি সামান্যকিছু পর্যবেক্ষণ সংযোজন করতে চাই এখানটায়।

সোহরাব হাসান তাঁর লেখার প্রথম কলামের তৃতীয় প্যারায় লিখেছেন- “……এই অভিযানের আরেকটি বৈশিষ্ট হলো ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠনের যেসব শীর্ষ নেতা দুর্বৃত্যায়নের সঙ্গে জড়িত কিংবা যাঁরা ‘দলের ভেতরে দল ও রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র’ তৈরীর চেষ্টা করেছিলেন, তাঁদেরও ছাড় না দেওয়া। ক্ষমতাসীন দলের তিনটি সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের অব্যাহতি দেওয়া কিংবা পদত্যাগে বাধ্য করার কাজটি মোটেও সহজ ছিলনা।”

তিনি লিখেছেন- “সমালোচকদের কেউ কেউ বলেছেন, ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের কারও কারও দৌরাত্ম্য এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে এই অভিযান চালানো ছাড়া সরকারের আর কোন উপায় ছিল না।”

সোহরাব হাসান অবশ্য পাশাপাশি এটাও লিখেছেন- “কিন্তু এ কথাও স্বীকার করতে হবে যে যাঁরা এতদিন অর্থ ও মাস্তানির জোরে নিজেদের আইনের উর্ধ্বে ভেবেছেন, শেখ হাসিনা তাদের আইনের আওতায় এনেছেন। এ অভিযানে দেশের মানুষ তো বটেই, আওয়ামী লীগের পোড়খাওয়া নেতা-কর্মীরাও স্বস্তি বোধ করছেন।”

এরপরে লেখক-

এরশাদ, খালেদা জিয়া ও সেনাসমর্থিত সরকারের আমলে পরিচালিত “দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের” একটি তুলনামূলক ব্যাখ্যা দিয়ে লিখেছেন- “এবারের অভিযানের ইতিবাচক দিক হলো এটি শুরু হয়েছে ‘নিজের ঘর’ থেকেই। নেতিবাচক হলো ক্ষমতার ১১ বছরের মাথায় এটা শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে দেশের অনেক ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে যে বিপুল পরিমান অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে, তা উদ্ধার করা কঠিন হবে।”

অবশ্য এই পর্যবেক্ষণটির পাশাপাশি তিনি আরও লিখেছেন- “তারপরও জঙ্গী দমনের মতো দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী যে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন, তার প্রতি বেশীরভাগ মানুষ আস্থা রাখতে চায়।”

সোহরাব হাসানের কথার সাথে একমত হয়েও বলছি- বর্তমান সরকারের পক্ষে বিগত ১১ বছরের (লেখকের উল্লেখিত) প্রথম দিন থেকেই কিংবা তার নিকটবর্তী সময়ে কি ‘চলমান এই অভিযান’ পরিচালনা করা সম্ভব ছিল? লেখক উল্লেখ করেছেন- “জঙ্গী দমনের মতো দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী যে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন, তার প্রতি বেশীরভাগ মানুষ আস্থা রাখতে চায়।”

লেখকের উলেখিত এই “জঙ্গী দমন” কি খুব সহজ কাজ ছিল? এটা কি খুব স্বল্প সময়ে দমন করতে পারার মত একটি বিষয়? এই “জঙ্গীপনার” পেছনে কি দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র এবং অন্যান্য অনেক গোষ্টির মদদ ছিলনা! এখনো কি সেই চেষ্টা সম্পূর্ণভাবে তিরোহিত হয়েছে? প্রশ্নগুলো লেখকের কাছে নয়- বরং উনার উত্থাপিত ‘প্রসঙ্গের’ সূত্র ধরে আমাদের সবার সামনে উপস্থাপন করছি মাত্র।

২০০৮ সালে এই সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র কয়েকদিনের মাথায়ই তো বিডিআর-এর মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটলো। এরপর তো ধারাবাহিকভাবেই বড়ো বড়ো সব জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ঘটনা দূর্ঘটনা সামাল দিয়েই সরকারকে এগোতে হয়েছে।

কথা আসবে- একটি দেশের সরকার পরিচালনা করতে গেলে শুধু এসব কেন- এর চাইতে বড়ো এবং অনেক দুর্যোগপূর্ণ ঘটনা এবং পরিস্থিতিকে সামাল দিয়েই তো সরকারকে দেশ পরিচালনা করতে হবে। আমিও মানি সেটা।

নিশ্চই, সেই ধরণের আরো সব বড়ো বড়ো জ্বালো পোড়াও-এর মত ঘটনা, এমন কি, বাড়িঘর যানবাহন জ্বালানোর পাশাপাশি মানুষ পোড়ানোর মতো নির্মম ঘটনাকে শক্ত হাতে সামাল দিয়েই তো এই সরকার এতদূর পর্যন্ত এসেছে। বাংলাদেশে এই সরকার তো ‘বকুল বিছানো পথ’ কোনদিন পেয়েছে বলে মনে হয় না!

দুর্নীতি দমন নিয়ে কাজ করেন এমন একটি সংস্থার প্রধানের সাথে আলাপের প্রসঙ্গ টেনে তিনি লিখেছেন- “……সিঙ্গাপুরের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করা যেতে পারে। গত শতকের ষাটের দশকে সিঙ্গাপুরও একটি অনুন্নত এবং দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ ছিল। কিন্তু লি কুয়ান ইউ প্রধানমন্ত্রী হয়ে দুর্নীতিকে দেশের এক নম্বর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন। প্রথমেই তিনি দুর্নীতির ফাঁকফোকরগুলো বন্ধ করতে বৃটিশ প্রবর্তিত আইনগুলোর ব্যাপক সংস্কার করেন (আমরাও বৃটিশ ঔপনিবেশিক আইনের উত্তরাধিকার বহন করছি)। ……তিনি সঠিক কাজের জন্য সঠিক লোককে নিয়োগ দেন। সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বাড়িয়ে দেন; যাতে কেউ আর্থিক অসচ্ছলতার অজুহাত দেখিয়ে দুর্নীতি না করেন। আমাদের দেশেও সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা অনেক বেড়েছে। এখন দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। সব ক্ষেত্রে আইনের গতি সমান হতে হবে। কোন ক্ষেত্রে আইন অতিশয় গতিশীল ও কোনো ক্ষেত্রে মন্থর হলে চলবে না।”

লেখকের উল্লেখিত এই প্রসঙ্গটি (সিঙ্গাপুর) নিয়ে দেশের কারো মতভেদ আছে বলে মনে হয় না। তবে এখানে কয়েকটি ব্যাপার খুব সতর্কতার সাথে লক্ষ্য করা প্রয়োজনঃ ১) ১৯৬৩ সালের ৩১ আগস্ট ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা পায় সিঙ্গাপুর। সেদিন, এই সিঙ্গাপুরেই বৃটেনের পতাকাটি নেমেছে আর সিঙ্গাপুরের পতাকাটি উত্তোলন করা হয়েছে, আপোষে। এই স্বাধীনতা লাভের জন্য সিঙ্গাপুরকে বৃটেনের সাথে কোন যুদ্ধ করতে হয় নি। এর পর একই বছরে মাত্র এক মাস পর- ১৯৬৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুর মালয়শিয়ার সাথে একীভূত হয়, কিন্তু ১৯৬৫ সালের ৯ আগস্ট আবার পৃথক হয়ে যায়। লি কুয়ান ইউ সিঙ্গাপুরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, এবং তিরিশ বছর যাবত তিনি সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্টিত ছিলেন। স্মর্তব্য, লি কুয়ানকে কিন্তু একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তুলতে হয় নি। মোকাবেলা করতে হয় নি স্বাধীনতার প্রতিপক্ষকে! আরও আছে-

২) বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন-

সিঙ্গাপুর কিন্তু একটি নগর রাষ্ট্র। বলা হয়ে থাকে, সিঙ্গাপুর প্রকৃতপক্ষে- “একটি নগর (দ্বীপ), একটি দেশ” (one city one country)। সিঙ্গাপুরের আয়তন- সাত হাজার এক শত দুই বর্গকিলোমিটার, যা বাংলাদেশের ভৌগলিক আয়তনের প্রায় সাত ভাগের এক ভাগ। সিঙ্গাপুরের জনসংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৫৬ লাখ। লি কিউ যখন ক্ষমতায় আসেন (১৯৬৩) তখন সিঙ্গাপুরের জনসংখ্যা ছিল সতের লাখ মাত্র। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের রাজধানী শহর শুধুমাত্র ঢাকার বাসিন্দাই বর্তমানে দেড় কোটির মত। বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জগুলো সেই নিরিখে অনেক বেশী।

৩) বাংলাদেশকে আজ থেকে ৪৯ বছর আগে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়েছে, যে কাজটি (যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন) সিঙ্গাপুরকে করতে হয়নি। বাংলাদেশের লড়াই সংগ্রামের এখানেই শেষ নয়। স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছর পরে, পঁচাত্তরের জঘন্য হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে- দেশ স্বাধীন হলেও বাংলাদেশে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি নির্মূল তো হয়ই নি, বরং গোপনে তারা প্রচন্ড শক্তি সঞ্চয় করে সুযোগের অপেক্ষাতেই যে আত্মগোপনে ছিল- সেটা তারা প্রমাণ করেছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারের হত্যার মধ্য দিয়ে।

এরপরে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি যে উদ্দেশ্যে এবং যে চেতনার ভিত্তিতে স্বাধীন হয়েছিল (চার মূল নীতি), সেটাকেই মুছে ফেলার চেষ্টা হল। ইতিহাস-ঐতিহ্যের মূল চাকাকে ঘুরিয়ে দেয়া হল উল্টোদিকে। সেই বিপরীত সময় থেকে বেরিয়ে আসতেই তো বাংলাদেশের চলে গেলো প্রায় দুই যুগ!

৪) পক্ষান্তরে, লি কুয়ান সিঙ্গাপুর রাষ্ট্রের অভ্যুদয় থেকে পরবর্তী তিরিশ বছর টানা প্রধান মন্ত্রীর আসনে আসীন থেকে রাষ্ট্রের স্টিয়ারিং নিয়ন্ত্রণ করেছেন। ১৯৯০ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদে ইস্তফা দিলেও সিনিয়র মন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছেন ২০০৪ সাল পর্যন্ত। এরপরে, লি কুয়ান তাঁর নিজের সন্তান লি সিয়েন লং (Lee Hsien Loong)-এর অধীনে মিনিস্টার মেন্টর (এডভাইজারি পোস্ট) হিসেবে ছিলেন ২০১১ পর্যন্ত।

*রাষ্ট্র নায়ক হিসেবেই শুধু নয়, লি কুয়ানের ব্যক্তিজীবন এবং পড়াশোনার বহর ছিল জাহাজ সমান। তিনি কেমব্রীজ থেকে অর্থনীতিতে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করার পরে, আবার আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে ব্যারিস্টারিও করেছেন। লি কুয়ান তাঁর বিদ্যাবুদ্ধি দিয়ে অনুধাবন করেছিলেন- একটি নিমজ্জিতপ্রায় রাষ্ট্রকে (সিঙ্গাপুর) উদ্ধার করতে হলে একক এবং দৃঢ নেতৃত্বের কোন বিকল্প নাই। যেখানে সততা, দক্ষতা এবং দূরদর্শিতাই হবে চালিকাশক্তি।

*বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়-

লি কুয়ান সর্বমোট প্রায় ৫৪ বছর মন্ত্রীত্ব করেছেন।

ইন্টারনেটের একটি তথ্য বলছে- Lee Kuan Yew (16 September 1923 – 23 March 2015), was the first Prime Minister of Singapore, governing for three decades. Lee is recognized as the nation’s founding father, with the country described as transitioning from the “third world country to first world country in a single generation” under his leadership.

Lee chose to step down as Prime Minister in 1990, he served as Senior Minister under his successor Goh Chok Tong until 2004, then as Minister Mentor (an advisory post) until 2011, under his own son Lee Hsien Loong. In total, Lee held successive ministerial positions for 56 years.

*শুধুমাত্র দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারাটাই উন্নয়নের (আলোচ্যক্ষেত্রে দুর্নীতি অপসারণে) একমাত্র পূর্বশর্ত নয় নিশ্চয়। আমাদের দেশে কোন ইতিবাচক কাজ করতে হলে ‘কর্ম সম্পাদনের’ পাশাপাশি উল্টোস্রোতকে সামাল দিতে হয় মূল কাজের চাইতেও দ্বিগুন শক্তি দিয়ে।

পদ্মা সেতু নির্মাণের কথাই ধরুণ না।

দুর্নীতির অজুহাত দেখিয়ে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর অর্থায়ন থেকে সরে গেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ শুরু করে এখন এর কাজ সমাপ্তির প্রায় কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছেন। সেই অবস্থায় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া উন্মুক্ত সভায় একদিন বলে বসলেন- “জোড়াতালির পদ্মা সেতুতে কেউ উঠবেন না। পদ্মা সেতুর স্বপ্ন দেখাচ্ছে সরকার। কিন্তু পদ্মা সেতু আওয়ামী লীগের আমলে হবে না। এ সেতু জোড়াতালি দিয়ে বানানো হচ্ছে। এ সেতুতে কেউ উঠবেন না” (সুত্রঃ প্রথম আলো অনলাইন, ২ জানুয়ারি, ২০১৮)।

শুধু কি এইটুকুই! এইতো ক’দিন আগের কথা।

পদ্মা সেতু প্রসঙ্গে কোন এক বিদেশী কর্মকর্তা নাকি একবার উচ্চারণ করেছিলেন- we need more head (এখানে head কিন্তু মেধা অর্থে ব্যবহৃত)। কিন্তু একটি মহল ছড়িয়ে দিল- “পদ্মা সেতু সম্পন্ন করতে হলে জ্যান্ত মানুষের মাথা কেটে পদ্মা সেতুর মাঝামাঝি সীমানায় বলি দিতে হবে।”

তারপরে শুরু হল বলি দেবার জন্য মাথার সন্ধান!

বেশ খুঁজেটুজে তাদের পছন্দ হল বাচ্চাদের মাথা। এরপরের কাহিনী সবার জানা! ছেলেধরার নামে কতজনকে পেটানো হল, হত্যা করা হল কত নিরীহ নারী পুরুষকে! হায় রে মানুষ!

পদ্মা সেতু তার নিজস্ব গতিতেই এগিয়ে চলেছে।

কিন্তু গুজবের কারনে মাঝখান থেকে ঝরে গেল কতগুলো নিরীহ প্রাণ! আজ একটি গুজবের রেশ থমলো তো পরের দিন অন্যরূপে ছড়াবে আরেকটি গুজব- ভিন্ন আঙ্গিকে! আসলে এই গুজব ছড়ায় যারা, তাদের মূল উদ্দেশ্য কিন্তু দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরী করে উন্নয়ন ব্যহত করে বাংলাদেশকে পিছিয়ে দেয়া! অন্যকিছু নয় বোধ করি।

সিঙ্গাপুরের কিংবদন্তী প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ানের সমালোচনাও কিন্তু কম নেই! ইন্টারনেটের এক জায়গায় দেখা যায়, একজন লিখেছেন- Lee’s rule was criticized for curtailing civil liberties (media control and limits on public protests) and bringing libel suits against political opponents. He argued that such disciplinary measures were necessary for political stability which, together with the rule of law, were essential for economic progress, [8][9] once saying: “Anybody who decides to take me on needs to put on knuckle-dusters. If you think you can hurt me more than I can hurt you, try.

ঠান্ডা মাথায়, খুব শক্ত হাতে সিঙ্গাপুরকে শাসন করে গড়ে তুলেছেন লি কুয়ান ইউ। অভিনন্দন।

শ্রদ্ধেয় সোহরাব হাসান তাঁর লেখার প্রায় শেষভাগে এসে ন্যায়নীতি এবং মূল্যবোধের উদাহরণ দিতে গিয়ে লিখেছেন- “লি কুয়ানের (সিঙ্গাপুরে) পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী ছিলেন উই তুন বুন। তিনি ঠিকাদারের খরচে একবার সপরিবারে ইন্দোনেশিয়া সফর করেন। এ ছাড়া তিনি ৫০ হাজার সিঙ্গাপুরি ডলার দিয়ে একটি বাড়ি কিনেছিলেন, যার জিম্মাদার ছিলেন ওই ঠিকাদার। এই অভিযোগে উই তুনের বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং তাঁকে সাড়ে চার বছর জেল খাটতে হয়।

দ্বিতীয় ঘটনাটি আরো মর্মান্তিক। লি কুয়ানের জাতীয় উন্নয়নমন্ত্রী তেহ চিং ওয়ানের বিরুদ্ধে পাঁচ লাখ সিঙ্গাপুরি ডলার ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ছিল। এটি সিপিআইবি তদন্ত করার দায়িত্ব পায়। মন্ত্রী তখন লি কুয়ানকে অনুরোধ করেন- তিনি (প্রধানমন্ত্রী) যেন সংস্থাটির প্রধানকে তাঁর বিষয়টি সদয় দৃষ্টিতে দেখতে বলেন। উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আমি যোগ্য লোককেই ওই দায়িত্ব দিয়েছি, আমি তাঁর কাজে হস্তক্ষেপ করতে পারি না’। ওই মামলার চার্জশিট দেওয়ার আগেই সেই উন্নয়নমন্ত্রী আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার আগে তিনি দায় স্বীকার করে একটি নোটও লিখে যান।” ব্যাপারগুলো শিক্ষনীয় বটে।

লেখক একদম শেষে গিয়ে প্রশ্ন রেখেছেন-

“………প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কি বাংলাদেশের লি কুয়ান হতে পারবেন?” সুন্দর প্রশ্ন। আমি লেখকের প্রশ্নের অন্তর্নিহিত সুর হৃদয়ঙ্গম করতে পারি নিশ্চয়। উনি লি কুয়ানের মত নির্লোভ, স্বচ্ছ এবং দক্ষ একজন দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনায়কের প্রত্যাশায় এই প্রশ্নটি উত্থাপন করেছেন বলে মনে করি। আমিও উনার সাথে একমত।

তবে উনার প্রত্যাশার চাইতেও আমি কিন্তু কয়েক ধাপ এগিয়ে আছি আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, এরমাঝেই দেশের অনেকগুলো ইতিবাচক কর্মকাণ্ড দিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্বসভায় মর্যাদার যে আসনে আসীন করেছেন সেটা অনন্যসাধারণ। এবং বর্তমানে চলমান দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযানে তিনি সফলতার মাইলপোস্ট অতিক্রম করতে সক্ষম হলে- কোন লেখক সম্পাদক হয়তো আগামীতে কোনদিন লিখবেন- “শেখ হাসিনা, …… (অমুখ) ও শুদ্ধি অভিযান”-এর কথা! সেদিন বরং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-ই হবেন বিশ্বের কাছে অনুকরণীয় আর অনুসরণীয় এক সফল রাষ্ট্রনায়ক। আমার প্রত্যাশার সেই দিন আশাকরি খুব বেশী দূরে নয়।

শ্রদ্ধেয় সোহরাব হাসানকে অসংখ্য ধন্যবাদ তাঁর অসাধারণ লেখনির জন্য।

জয় হোক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার।

জয় বাংলা। বাঙালির জয় অবশ্যম্ভাবী।

লেখক: কাওসার চৌধুরী

অভিনেতা ও গণমাধ্যমকর্মী

মুনার অচেনা শহর | পঞ্চম পর্ব