যুদ্ধের ডামাডোলে জমি কিনতেন শহীদুল্লাহ কায়সার!

image

শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লা কায়সার ও জহির রায়হানের পরিবারের মধ্যে চলছে সম্পত্তি নিয়ে পারিবারিক বিরোধ। এক পরিবার অন্য পরিবারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের আঙুল তুলছেন। আর এই মাঝে বেরিয়ে আসছে নানা অজানা কাহীনি। শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লা কায়সারের ছেলে অমিতাভ কায়সার দাবী করেছেন যে, তাঁর বাবা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে গুলশানের জমি কিনিছেন। আর এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে তুমুল বিতর্ক।

জহির রায়হানের নাতিনী ভাষা রায়হান সম্প্রতি ফেসবুক মারফত সম্পত্তি দখলের অভিযোগ তোলেন। তার স্ট্যাটাসে শহীদুল্লা কায়সারের স্ত্রী পান্না কায়সার, মেয়ে অভিনেত্রী শমী কায়সার ও ছেলে অমিতাভ কায়সারের বিরুদ্ধে জহির রায়হানের সম্পত্তি দখলের অভিযোগ উঠেছে।

জহির রায়হানের নাতনী ভাষা রায়হান ফেসবুকে অভিযোগ করেছেন, গুলশানের বারিধারার এক বিঘা জমি এবং গুলশান আড়ংয়ের পেছনের তিন বিঘা জমি তার দাদার টাকায় কেনা হলেও সেই সম্পত্তিগুলো পান্না কায়সার, শমী কায়সার ও অমিতাভ কায়সার দখল করে রেখেছেন।

রায়হান পরিবারের এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে একটি গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠায় শাহীদুল্লা কায়সারের ছেলে অমিতাভ কায়সার।

ওই বিবৃতিতে অমিতাভ কায়সার চারটি বিষয় উল্লেখ করে নিজের ব্যাখ্যা তুলে ধরেন…

‘‘১। শহীদুল্লাহ কায়সার, গুলশানের ১ বিঘা জমিটি, ১৯৭১ সালের জুন মাসে তৎকালিন Dhaka Improvement Trust (DIT)এর মাধ্যমে, জনাবা ফাতেমা রিজওয়ানির কাছ থেকে কিনে নেন। এ সন্ক্রান্ত যাবতিয় দলিলাদি আমার কাছে আছে।

২। আমার ছোট চাচা, জনাব সাইফুল্লাহ বলেছেন যে উনি অনেক দৌড়াদৌড়ী করেছেন জমিটি চার ভাইয়ের মধ্যে ভাগ করার জন্য। যেহেতু জমিটি আমার বাবার ও তার পুত্র সন্তান বিদ্যমান, আমার মা ১৯৭৬ সালের জুলাই মাসে DIT থেকে আমার ও আমার বোনের নামে জমিটি Mutation করেন। এ সন্ক্রান্ত যাবতিয় দলিলাদি ও মহামান্য হাই কোর্টের এফিডেভিট আমার কাছে আছে। আমার জ্ঞানত, আমার কোনো চাচা, ফুফু অথবা আমার কোনো চাচাত ফুফাত ভাই বা বোন আমার সাথে কখনো এ বিষয়ে কোনো কথা বলেনি। অথচ আজ এতকাল পরে এসে তারা শুধুমাত্র লোভের বশবতি হয়ে এই সম্পত্তিতে ভাগ বসাতে চাচ্ছে। আমার মা ৭৯ সালে, ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে অনেক কষ্ট করে একটি দ্বিতল ভবন নির্মান করেন।

৩। আমার ছোট ফুফু বলেছেন, সমস্ত পরিবারটি চলতো জহীর রায়হানের আয়ে। অথচ এই পরিবারে শহীদুল্লাহ কায়সার ছিলেন সবচেয়ে স্বচ্ছল। তিনি ছিলেন এই পরিবারের বটবৃক্ষ, সবার মাথার উপর ছায়া। এই সময়ের মধ্যে তাঁর দুটো বই বিখ্যাত হয়েছে (সারেং বউ, সংশপ্তক) এবং তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কারে ভুষিত হয়েছেন। তিনি ছিলেন তৎকালিন বিখ্যাত সংবাদপত্র দৈনিক সংবাদের নির্বাহী সম্পাদক, পূর্ব পাকিস্তান প্রেস ক্লাবের সভাপতি। তারপরও আমার ভাবতে কষ্ট হয় যে, ছোট বোন হয়ে বড় ভাইয়ের প্রতি সামান্য শ্রদ্ধাবোধও তিনি দেখালেন না।

৪। শহীদুল্লাহ কায়সার ৩ বার লম্বা সময় জেলে থেকেছেন। তৎকালিন সরকারের জন্য তিনি ছিলেন হুমকিস্বরুপ। অন্য আরো অনেকর মতো তিনি ভারতে চলে যাননি। দেশে থেকে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করার। আজ যে কথাগুলো জহীর রায়হান তনয় বিপুল রায়হান এবং তার মেয়ে ভাষা বলছে, তা শুধুমাত্র শহীদুল্লাহ কায়সারের নামটিতে দাগ লাগানোর জন্য এবং তার পরিবারকে ছোট করার জন্য । ভাষা আরো অভিযোগ করেছে আড়ং এর পেছনের জমি নিয়ে। এই জমিটিও আমার বাবার। আমরা অনেক চেষ্টা করেছিলাম কাগজপত্রগুলো বের করার জন্য। কিন্তু সেটা আর হয়নি। পরবর্তীতে, হাতীরঝীল প্রকল্পের জন্য সরকার এই জমিটি অধিগ্রহন করে। এর বিনিময়ে আমরা সরকার থেকে কখনোই কোনো কিছু দাবী করিনি বা নেইনি। আসল ঘটনা না যেনে ভাষার এ বিষয়ে কোনো কথা বলা বোকামির নামান্তর।’’

এদিকে গণমাধ্যমে পাঠানো অমিতাভ কায়সারের বিবৃতির জবাবে ফেসবুকে আরেকটি বিবৃতি প্রদান করেন বিপুল রায়হান। বিপুল রায়হানের বিবৃতিটি নিচে তুলে ধরা হলো-

‘‘আগাগোড়া ভুল বানানে ভুল শব্দচয়ন, ভুল শব্দচয়নের মাধ্যমে ভুল বাক্যগঠন, ভুল বাক্যগঠনের মাধ্যমে ভুল তথ্য পরিবেশন, ভুল তথ্য পরিবেশনের মাধ্যমে চরম মিথ্যাচার, এমনকি চরম মিথ্যাচারের মাধ্যমে কী ভীষণ ঔদ্ধত্বপূর্ণ কথা বলা হয়েছে বিবৃতিটিতে। এই বিবৃতি পাঠের প্রতিক্রিয়ায় আমাকে আবারও, এই অসুস্থ শরীরেই, কলম হাতে তুলে নিতে হল।

বিবৃতিটি পড়তে গিয়ে প্রথমেই আমি যারপরনাই বিস্মিত হয়েছি! দেশে ক্যাডেট কলেজের পাঠ শেষ করে বিদেশ থেকে প্রকৌশল বিদ্যায় পড়াশোনা করে আসা অমিতাভ কায়সার কীভাবে এই ভুল করলেন, তা এখনও আমার বোধগম্য হচ্ছে না! প্রাথমিক পর্যায়ের লেখাপড়া করা যে কেউই নিজের বাবার নামটি অন্ততঃ ঠিকঠাক লিখতে জানেন। অমিতাভ নিজের বাবার নাম লিখেছেন “শহীদুল্লাহ কায়সার”, আদতে আমার জ্যাঠার নাম “ শহীদুল্লা কায়সার”। অমিতাভ তাঁর চাচার নাম লিখেছেন “জহীর রায়হান”, আদতে আমার বাবার নাম “জহির রায়হান”। তিনি লিখেছেন, “শহীদ বুদ্ধিজীবি”, না ভাই আদতে তাঁরা দুজনই হলেন “শহীদ বুদ্ধিজীবী”। অন্যসব ভুল বানান , ভুল শব্দচয়ন কিম্বা ভুল বাক্যগঠন এড়িয়ে যেতে পারলেও, এই তিনটি শব্দের ভুল বানান আমাকে বিস্মিত করেছে। একইসঙ্গে পীড়াও দিয়েছে বৈকি। তাই এই দিয়েই শুরু করলাম।

১, ২, ৩, ৪ করে মোট চারটি ভাগে অমিতাভ তাঁর বক্তব্য লিখেছেন। আমিও আলাদা করে প্রতিটির উত্তরে এক, দুই, তিন, চার করে মোট চারটি অধ্যায়ে আমার প্রতিক্রিয়া পেশ করছি।

এক

আমি স্তম্ভিত! সত্যগোপন ও মিথ্যাচার করতে গিয়ে তিনি এসব কী বলছেন!? নিছক সম্পত্তির লোভে তিনি যে তাঁর বাবা শহীদুল্লা কায়সারকে চরম অপ্রিয় প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন!!

সমগ্র পাকিস্তানের প্রথম রঙিন সিনেমা, জহির রায়হান পরিচালিত ‘সঙ্গম’ ছবিটি ১৯৬৪ সালে মুক্তি পায়। এই ছবিটি তখন পুরো পাকিস্তানে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং সুপারহিট ব্যবসা করে। একইসঙ্গে অনেক টাকা জহির রায়হানের হাতে আসে। সেই টাকা থেকেই ১৯৬৫ সালে গুলশানের ৬৫ নম্বর সড়কের ১৯ নম্বর প্লটটি জহির তাঁর অগ্রজ শহীদুল্লা কায়সারের নামে কেনেন। কেন শহীদুল্লার নামে জমিটি কেনা হয়, তা আলোচনার এই পর্যায়ে অনাবশ্যক বিধায় আপাততঃ উল্লেখ করছি না। কাকতালীয় হলেও লক্ষ্য করবার বিষয়, ১৯৬৫ সালে কেনা জমি, যার প্লট নম্বর ১৯ আর সড়ক হচ্ছে ৬৫!

‘জহির রায়হানের টাকায় সম্পত্তিটি কেনা হয় নি’ এরকম একটি ধারণা দেয়ার অভিপ্রায়েই সম্ভবতঃ তিনি ১৯৭১ সালের জুন মাসে জমিটি কেনা হয় বলে উল্লেখ করেছেন। কেননা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সেই সময়ে জহির রায়হান তাঁর অস্ত্র “ক্যামেরা” হাতে যুদ্ধের বিভিন্ন সেক্টরে ছুটে বেড়াচ্ছেন। অর্থাৎ তাঁর উল্লেখিত “সেই নির্দিষ্ট সময়”টিতে জহির ঢাকায় ছিলেন না, তাই তাঁর “টাকায়” সম্পত্তি কেনার প্রশ্নও আসছে না। কিন্তু তিনি যে আরও গুরুতর প্রশ্নের অবতারণা করে ফেলেছেন, তার কি হবে?

তিনি বলেছেন, জনৈক ফাতেমা রিজওয়ানির কাছ থেকে সেই সময় জমিটি কেনা হয়, যার যাবতীয় দলিল তাঁর কাছে আছে। আমরা কিন্তু কখনওই বলিনি যে, জমিটি শহীদুল্লা কায়সারের নামে কেনা হয় নি। অমনটি হলে তো ল্যাঠাই চুকে যেত। তাই জমির “কাগজ” নিয়ে আমার কোনও মাথাব্যথা নেই। তবে হ্যা, অন্য “কাগজ” নিয়ে আমার মাথাব্যথা আছে বৈকি। আর তা বেশ জোড়ালোভাবেই আছে। সেই বিশেষ “কাগজ”টির প্রসঙ্গও এখানে অনাবশ্যক বিধায় আপাততঃ উল্লেখ করছি না।

তারপরও তর্কের খাতিরে তাঁর দেয়া তথ্যটিকে সঠিক বলে ধরে নিলে যে ভীষণ গুরুতর প্রশ্নটির উদয় হয়, তা হল, সারাদেশের মানুষ যখন প্রত্যক্ষ কিম্বা পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে শামিল, মুষ্ঠিমেয় কিছু পাকিপ্রেমী সুবিধাভোগী ছাড়া আর সকলেরই স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সিঁকেয় উঠেছে, তখন শহীদুল্লা কায়সার দিব্যি জমিজমা কিনে বেড়াচ্ছেন!

কী সাংঘাতিক!!

দুই

এই পর্যায়ে তিনি চাচা সায়েফ উল্লাহ্‌র নাম উল্লেখ করে বিষোদগার করেছেন। বলেছেন, কেউ নাকি কখনওই এইসব জমিজমার বিষয়ে কথা বলেন নি! কী চরম মিথ্যাচার!! বস্ততঃ গত আটচল্লিশ বছরে বিভিন্ন সময়ে এইসব বিষয়ে আলোচনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কখনও কখনও আলোচনা হয়েছেও। যার কোনও কোনওটিতে তিনিও উপস্থিত থেকেছেন। একটি ঘটনার স্মৃতি তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেই।

আমাদের চাচা শাহরিয়ার কবিরের উদ্যোগে, তাঁরই বাসায়, ১৯৮৬ সালে সবাই মিলে বসা হয়। সেই সময় বড় ফুপু নাফিসা কবির ঢাকায় এসেছিলেন। জীবিত ছিলেন চাচা জাকারিয়া হাবিব, আলমগীর কবির, কালান্দিয়ার কবির, মেজ ফুপু সুরাইয়া বেগম এবং আমার মা সুমিতা দেবী। অপু ও তপু রায়হানও উপস্থিত ছিলেন। তবে কোনও কারনে তাঁদের মা কোহিনুর আখতার সুচন্দা উপস্থিত থাকতে পারেন নি। সেদিন আলোচনা যখন একটি ইতিবাচক পরিসমাপ্তির দিকে এগোচ্ছিল, তখন তাঁর মা পান্না কায়সার অকস্মাৎ উত্তেজিত হয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করে “অসুস্থ” হয়ে পড়ার চরম নাটকীয় পরিবেশের সৃষ্টি করে সবকিছু ভেস্তে দেন।

আরও বলেছেন, আজ এতকাল পরে সবাই লোভের বশবর্তী হয়ে সম্পত্তিতে ভাগ বসাতে চাচ্ছেন। আচ্ছা বেশ, একটি প্রশ্ন করি। ৩০ জানুয়ারি জহির রায়হান নিখোঁজ হয়ে যাবার পর, সাত তাড়াতাড়ি তাঁদের দু ভাইবোনকে নিয়ে তাঁর মা পান্না কায়সার কায়েতটুলীর বাড়ি ত্যাগ করেন কেন? চাচা সায়েফ উল্লাহ কিম্বা মরহুম চাচা জাকারিয়া হাবিব কি তাঁদের বের করে দিয়েছিলেন? বাজে ব্যবহার করেছিলেন? তাঁর মা তো তখন কেবলই একজন গৃহিণী, যেমনটি ছিলেন আমাদের চাচী নীলা হাবিব। কই জাকারিয়া হাবিবের মৃত্যুর পরতো নীলা চাচী তাঁর বাচ্চাদের নিয়ে ও বাড়ি ত্যাগ করেন নি! তাহলে!? বেশ উত্তরটা আমিই দেই। তাঁর ‘চরম লোভী’ মা ঐ মুহূর্তে সেই বাড়িটি ত্যাগ করেন, কারন এতে করে তিনি তিন দিক থেকেই লাভবান হয়েছিলেন। শহীদ পরিবার হিসেবে নিউ ইস্কাটনের বিশাল বাড়িটির বরাদ্দ, নিজের জন্য অধ্যাপনার চাকরি আর সর্বোপরি সেইসব জমিজমার দলিলপত্র নিয়ে সটকে পড়া, যাতে করে কেউ আর ওসব ব্যাপারে কথা বলতে না পারেন। একবার ভাবুন, তখন তো তিনি, তাঁর বোন নেহাৎ শিশু, আর তাঁদের মা নিছক গৃহিণী; তো সেদিন যদি কায়েতটুলির বাড়ি ছেড়ে যাবার সময় তাঁর বয়ানে “লোভী” চাচা সায়েফ উল্লাহ বা জাকারিয়া হাবিব সেইসব জমিজমার কাগজগুলো রেখে দিতেন! তাহলে!? কেন তাঁরা অমনটি করেন নি? কারন তাঁর বয়ান পড়ে যেমনটি মনে হয় “বাংলা সিনেমার ভিলেনের মত লোভী ও অমানবিক” তাঁরা ছিলেন না।

তবে এই পর্যায়েই অবশ্য ভীষণ অমানবিক একটি ইঙ্গিত তিনি দিয়েছেন। ‘যেহেতু জমিটি আমার বাবার ও তার পুত্র সন্তান বিদ্যমান” এই কথা দ্বারা তিনি কী বোঝাতে চাইছেন? তিনি কি এরকমই একটি ইঙ্গিত দিচ্ছেন না যে, তিনি না থাকলে, তাঁর পিতার সম্পত্তির ওপর তাঁরই বোন শমী কায়সার একমাত্র উত্তরাধিকারী হতেন না এবং তখন পরিবারের অন্যদেরও সেই সম্পত্তির ওপর ভাগ বসানোর দাবিটা যৌক্তিক হয়ে উঠত? পিতার সম্পত্তির ওপর পুত্র ও কন্যা সন্তানের সমানাধিকারের বিষয়ে সাম্প্রতিক

সময়ে বাংলাদেশ সরকারের সুস্পষ্ট অবস্থান রয়েছে। যদিও তাঁর ওরকম একটি অমানবিক ইঙ্গিতে আমি মোটেও বিস্মিত হই নি। কারন ইতোপূর্বে তিনি নিজেই এ বিষয়ে আমাকে সরাসরি বলেছিলেন।

তিন

এই পর্যায়ে এসে তিনি ছোট ফুপু শাহেন শাহ বেগম সম্পর্কেও বিষোদগার করেছেন। ফুপুর অপরাধ, তিনি নির্জলা সত্যটি বলেছেন। অথচ এই ছোট ফুপুর কারনেই কিন্তু তিনি, আমরা সকলেই তাঁর বাবা শহীদুল্লা কায়সারকে কে ধরিয়ে দেয়, তা জানতে পারি। তাঁকে ধরে নিয়ে যাবার সময় খালেক মজুমদারের মুখের মুখোশটা তিনিই টেনে খুলে ফেলেছিলেন।

তিনি বলেছেন, এই পরিবারে শহীদুল্লা কায়সার ছিলেন সবচেয়ে স্বচ্ছল। আচ্ছা! এরকম হাস্যকর একটি বয়ান তিনি কিভাবে দিলেন!? সারেং বৌ, সংশপ্তকের কথা বলেছেন। দুটোই বিখ্যাত বই। তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তখনকার বিখ্যাত দৈনিক সংবাদের নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান প্রেসক্লাবের সভাপতি। এসব বলে তিনি কী বোঝাতে চাইছেন? শহীদুল্লা কায়সারের আয়ের উৎস এবং তিনি কত স্বচ্ছল ছিলেন, তাই?

বেশ, তাহলে সংশ্লিষ্ট কিছু তথ্য জেনে নিন। শহীদুল্লার উল্লেখিত দুটো বই যেমন জনপ্রিয়, তেমনি জনপ্রিয় জহিরের আটটি বই। শহীদুল্লার অনেক আগেই জহির বাংলা একাডেমি পুরস্কারেও ভূষিত। বস্তুতঃ লেখক শহীদুল্লার জন্মই হয়েছে অনুজ জহিরের প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণায়। এই ২০১৯ এ এসেও সারা বছরে জহিরের বই যে পরিমান বিক্রি হয়, তার অর্ধেকও শহীদুল্লার বইয়ের বিক্রি নেই। সেই জহির রায়হানের বইয়ের বিক্রিও নব্বই দশকের শুরুর দিক পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য ছিল না। সবাই জানেন, এদেশে সৃজনশীল বইয়ের পাঠকশ্রেণী তৈরিই হয়েছে হুমায়ূন আহমেদের হাত ধরে। তার আগ পর্যন্ত কোনও লেখকেরই সেরকম কাটতি ছিল না । আর এখন যে, এদেশে লেখকেরা বইয়ের দামের শতকরা পনের ভাগ রয়্যালটি পাচ্ছেন, তাও আমাদের চাচা শাহরিয়ার কবিরের হাত ধরে। বাংলা একাডেমি যখন তাঁর “নুলিয়াছড়ির সোনার পাহাড়” বইটি ছাপে, তখন থেকেই পনের শতাংশ রয়্যালটির চলটা চালু হয়। তার আগে অব্দি ছিল দশ শতাংশ।

এবার অংকটা মিলিয়ে নিন। সারেং বৌর চেয়ে সংশপ্তকের পৃষ্ঠাসংখ্যা বেশি, দামও বেশি। সেই সংশপ্তকের প্রথম সংস্করণের দাম কত ছিল জানেন ? দেড় টাকা। তার দশ শতাংশ লেখক রয়্যালটি প্রতিটি কপির জন্য দাঁড়ায় পনের পয়সা। আশা করি এ বিষয়ে আর কিছু বলা নিষ্প্রয়োজন।

আর সংবাদের চাকরি? সেই সময় সবচেয়ে জনপ্রিয় দৈনিক ছিল ইত্তেফাক। সবচেয়ে পেশাদারও। সংবাদ ছিল মূলতঃ বামপন্থী রাজনীতিকদের পুনর্বাসনের জায়গা। আর তাই আগে কখনও সাংবাদিকতা না করা শহীদুল্লা কায়সার সরাসরি নির্বাহী সম্পাদক হতে পেরেছিলেন। জানেন কি তাঁর চাকরি জীবনের বয়স? সাড়ে তিন বছর। আর এই সময়কালে তিনি যে বেতন পেতেন, তার অর্ধেকই পার্টির ফান্ডে জমা দিতে হত। এটাই ছিল তখন কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্ত। আর বেতন? মেয়েদের বয়স আর ছেলেদের বেতন নাকি উল্লেখ করতে নেই। অতএব থাক। আশা করি এ বিষয়েও আর কিছু বলার প্রয়োজন নেই।

এই অধ্যায়ে আর ছোট্ট দুটো তথ্য দিয়েই শেষ করছি। কায়েতটুলীর বাড়িতে দোতলায় শহীদুল্লা কায়সারের শয়নকক্ষটিও ছিল জহির রায়হানের টাকায় বানানো। এমনকি শহীদুল্লার যে ভক্সওয়াগন গাড়িটি ছিল, তাও জহিরেরই কিনে দেয়া।

চার

এই পর্যায়ে এসে তিনি চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ উক্তি করেছেন। আড়ংয়ের পেছনের জমি, শহীদুল্লার জেল জীবন, তৎকালীন সরকারের জন্য তিনি ছিলেন হুমকিস্বরূপ – এসব বিষয়ে আমার অনেককিছুই বলবার থাকলেও, আপাততঃ সেসব একপাশে সরিয়ে রাখছি। তাঁর চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ উক্তি “অন্য আরো অনেকের মতো তিনি ভারতে চলে যান নি”।

মানে!?

কি বোঝাতে চাইছেন তিনি!?

কাদের অপমান করছেন?

যাঁরা ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, তাঁদের?

নাকি বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে তাজউদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত মুজিব নগর সরকারের নেতৃবৃন্দকে?

পরিশেষে বলব, নিছক সম্পত্তির লোভে তিনি একদিকে যেমন তাঁর পিতা শহীদ শহীদুল্লা কায়সারকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন, অন্যদিকে তেমনি মহান মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কটাক্ষ করছেন।

তাঁর শুভবুদ্ধির উদয় হোক।

সূত্র: দেশরূপান্তর

আরো পড়ুন: বিনিয়োগ করলেই বৃটিশ পাসপোর্ট