শেষ বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম

কেন পিড়িতি বাড়াইলারে বন্ধ, ছেড়ে যাইবায় যদি? এমনই শত শত আবেগে ছোঁয়া জনপ্রীয় গানের রচয়ীতা ও সুরকার শাহ আবদূল করিম। একদিন গান করার অপরাধে গ্রাম থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন যিনি, তিনিই আজ বাঙালির কণ্ঠে বাসা বেঁধেছেন পরম মমতায়। শাহ আবদুল করিম সহজ কথার গাঁথুনিতে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষার জাল বুনে, একাধারে হাওর, নদী জীবন ঘনিষ্ঠ, দেহতত্ত্ব, বাউলতত্ত্ব, বিচ্ছেদ, ধামাইল, গণসংগীত, রাজনীতি, আল্লাহ, নবী ও ভাটির মানুষের দুঃখ দুর্দশার গন্ধসুধা গায়ে মেখে একের পর এক গান রচনা করেছেন। সুর দিয়েছেন, নিজে দরাজ কণ্ঠে গেয়েছেন এসব গান দেশে ও বিদেশে। বাউল সম্রাজ্যের শেষ সম্রাট ধরা হয় তাঁকে।

তিনি যে সুর সৃষ্টি করেছিলেন, তা চিরকালীন। সময়কে ধারণ করে গানের মাধ্যমে বলে গেছেন অকপট সত্য কথা। পৃথিবীতে এমন আরও মানুষ থাকলে পৃথিবীটা সত্যিই বদলে যেত।

সুনামগঞ্জের হাওর পাড়ের সন্তান বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের ১০ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। এ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচীর আয়োজন করেছে। বাউল শাহ আবদুল করিম স্মৃতি পরিষদ জন্মস্থান উজান ধল গ্রামের বাড়িতে তাঁর কর্ম ও সৃষ্টি নিয়ে এক আলোচনা সভার আয়োজন করেছে।

স্মৃতি পরিষদের চেয়ারম্যান ও করিমপুত্র শাহ নুর জালাল জানান,বাবার মাজারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন,মিলাদ মাহফিল,আলোচনা সভা ও করিমগীতির অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও অতিথিবৃন্দের উপস্থিতিতে সংগীত পরিবেশন করবেন এছাড়া স্থানীয় শিল্পীরা ।

তিনি আরো জানান, রাষ্ট্র, সমাজ এবং হাওরাঞ্চলের বঞ্চিত অবহেলিত মানুষের দুঃখ- দুর্দশা, হাসি-আনন্দ, প্রেম-বিরহ আর অধিকারের কথা তার গানে ফুটে উঠেছে। গানের মাধ্যমে সহজ সরল ভাষা আর হৃদয়কাড়া সুরের মাধ্যমে এসব বিষয় তুলে এনেছিলেন বাউল সম্রাট

শাহ আবদুল করিম স্থান করে নিয়েছেন অসংখ্য সংগীত প্রেমির অন্তরে। তার সৃষ্টির সবকিছুই যেনো মানুষের জন্য মানুষের কল্যাণের জন্য উৎসর্গকৃত।

সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘শাহ আবদুল করিমের সান্নিধ্য পেতে হলে তাঁর সৃষ্টিতে অবগাহন করতে হবে। আমাদের দেশে তাঁর মতো বহু প্রতিভা ছড়িয়ে আছে, ছিল। তথাকথিত ডিগ্রি না থাকলেও তাঁর রচনা অসাধারণ। এসব গান ও দর্শন বুঝতে হলে গভীর অনুধাবনশক্তি থাকা দরকার।’

শাহ আবদুল করিমের বড় স্বপ্ন ছিল নিজের বাড়িতেই ‘শাহ আবদুল করিম সংগীতালয়’ প্রতিষ্ঠার। দুঃখের বিষয়ে অর্থাভাবে আজ সেই সংগীতালয়টি অসমাপ্ত রয়ে গেছে। বিভিন্ন খাতে যা অনুদান এসেছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। আমরা সংগীতপ্রিয় মানুষেরা, দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা ভক্তেরা চাইলে বাউল সম্রাটের শেষ ইচ্ছানুযায়ী তাঁর অসমাপ্ত কাজটি সম্পন্ন করা সম্ভব। এই সংগীতালয় চালু হলে, শুদ্ধ বাউলচর্চাকে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। দেশ-বিদেশের অগণিত ভক্ত ছুটে আসবে বাউল গান শুনতে এবং গবেষণা করবেন নবীন বাউলেরা।

রাগীব-রাবেয়া সাহিত্য পদক, একুশে পদক, মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা, নিউইয়র্ক হাছন রাজা লোক উৎসব সম্মাননা, সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড আজীবন সম্মাননাসহ অজস্র পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন শাহ আবদুল করিম। কিন্তু তাঁকে প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে, যদি তাঁর শেষ ইচ্ছানুযায়ী আবদুল করিম সংগীতালয় প্রতিষ্ঠা করা যায়।

উল্লেখ্য,১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী দিরাইয়ের উজানধল গ্রামে সাধারণ এক কৃষক পরিবারে জন্ম নেন বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম।আর ২০০৯ সালে ১২ই সেপ্টেম্বর এই গুণী সাধকের মৃত্যু হয়।

আরো পড়ুন: পৃথিবী বাঁচাবে তেলাপোকা !