রুপোপজীবি | শেষ পর্ব

বাজে একটা চাকুরীর অফার পেলাম, মেইল এস্কর্টে কাজ করার।। মেইল এস্কর্ট হলো এক ধরণের পুরুষ পতিতা, যারা বিভিন্ন মহিলাদের সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে অর্থ উপার্জন করে।। কিন্তু আমি কোনভাবেই এই চাকুরী করতে ইচ্ছুক না।। যেখান থেকে জবের অফার আসছিলো, আমি একপ্রকার না করে দিয়ে চলে আসলাম।। এরমধ্যে আমার এক বন্ধু সাইফুল জানালো সে তার বউকে সন্দেহ করে, বিভিন্ন কারণে তার বউয়ের আচরণ তার কাছে সন্দেহজনক মনে হয়।। আমি সাইফুলকে পরামর্শ দিলাম ও যেনো ওর বাসার ড্রইং রুমে একটা গোপন স্পাই ক্যামেরা লাগায়, তাহলে হয়তো অনেক কিছু জানা যাবে।। পরিকল্পনামত তাই করা হলো, সাইফুলের ড্রইং রুমে ক্যামেরা লাগানো হলো।। আমি যে ব্যাচেলর বাসায় থাকি, সেখানে এক বড় ভাই জাহিদ হন্যে হয়ে চাকুরী খুঁজে বেড়াচ্ছেন, আমার কাছে চাকুরীর ব্যাপারে সাহায্য চাইলেন।। আমি সাতপাঁচ ভেবে তাকে ঐ এজেন্সীতে পাঠালাম, যেখানে তারা ছদ্মবেশে মেইল এস্কর্ট সংগ্রহ করে, তবে জাহিদ ভাইকে আমি আগেই কিছু বলি নাই, আমি ভাবলাম উনি যাক্‌, দেখি কি হয়।। উনি গুলশানের ওই অফিসে ইন্টারভিউ দিতে গেলেন ঠিকই, কিন্তু প্রায় দু’দিন যাবত তার মোবাইল বন্ধ, বাসায় ফিরেন নি, এক প্রকার লাপাত্তা হয়ে গেছেন বলা যায়।। জাহিদ ভাইকে নিয়ে আমার দুশ্চিন্তা হচ্ছিলো, এরমধ্যে আমার বন্ধু সাইফুল আমাকে বললো, ওর বাসায় কিছু একটা ঝামেলা হচ্ছে, সে মোবাইলের মাধ্যমে স্পাই ক্যাম মনিটরিং করে জানতে পারলো।। আমি তাকিয়ে দেখলাম, সাইফুলের বউ রুনা তার বাসায় মেইল এস্কর্টের মহিলা সদস্য সহ একজন অপরিচিত লোকের সাথে বেরিয়ে গেলো।। আমি সব কিছু সাইফুলকে চেপে যেতে বললাম, দেখা যাক্‌ আসলে ওর বউয়ের দৌড় কতটুকু।। এরমধ্যে সেই জাহিদ ভাইয়ের খোঁজ নিতে আমি আর সাইফুল গেলাম, মেইল এস্কর্ট অফিসে।। আসলে আরও একটা ব্যাপার জানার সুপ্ত ইচ্ছে নিয়ে, সাইফুলের বউয়ের সাথে এই অফিসের লোকদের কি সম্পর্ক।। অফিসে গিয়ে প্রায় একসাথে দুটো ঘটনা ঘটলো, সাইফুলের বউ এর সাথে আচমকা আমাদের সামনা- সামনি দেখা হয়ে গেলো, আর আমার একটা ফোন আসলো জাহিদ ভাইয়ের, সে নাকি অনেক বিপদে আছে।।

এই ছিলো, আগের দুই পর্বের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা!! যদি আগের দুই পর্ব না পড়ে থাকেন, তবে বিশদ আকারে জানতে অনুরোধ থাকবে পড়ে নেয়ার।

আরো পড়ুন : রূপোপজীবি | প্রথম পর্ব 

আরো পড়ুন : রুপোপজীবি | দ্বিতীয় পর্ব

সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেলো, সাইফুলের বউ!! মেয়েটা আমাদের দেখে এমন ভাবে দাঁড়িয়ে পড়লো, সেই চেহারার বর্ণনা কোন ভাষায় লিখে বোঝানো সম্ভব না।। কিংবা আমার মনে হয় কাউকে দিয়ে অভিনয় করালেও এই চেহারা পুরোপুরি ফুটিয়ে তোলা যাবে না।। তাসনুভাও হয়তো অবাক আবার আমাকে এখানে দেখে। সে কি জানে এই সাইফুল এই মেয়ের জামাই!!

আমরা কেউ কোন কথা বলছি না, এভাবে কতক্ষণ কেটে যাবে কে জানে………

ঠিক সেই মুহূর্তে, আমার ফোন বেজে উঠলো, কিছুটা মোহ ভঙ্গ করে ফোনটা ধরলাম, অপরিচিত নাম্বার থেকে কল।। ওপাশ থেকে একটা আর্তনাদ!  হয়তো জাহিদ ভাইয়ের কণ্ঠ- ভাই, আমাকে বাঁচাও ভাই, আমাকে বাঁচাও!! আমি মরে যাবো ভাই, আমাকে বাঁচাও!!

আমি কি রেখে কি বলবো, কোনমতে বললাম- জাহিদ ভাই নাকি, কই আপনি?? কি হইছে??

-ভাই, ভাই আমি জানি না আমি কই, আমাকে গাড়িতে তুলে চোখ বাইন্ধা কই আনছে, আমি জানি না ভাই।। তুমি আমারে বাঁচাও গো ভাই, আমি দুইদিন ধরে খাই নাই কিছু।।

আমি উত্তেজিত গলায় জিজ্ঞেস করলাম- কি বলেন, আপনাকে কই থেকে চোখ বাঁইধা নিছে, আর এখন কই, ভাই কিছু একটা বলেন!!

ওপাশ থেকে ঝট করে ফোন কেটে গেলো, সাইফুল আমার দিকে তাকিয়ে আছে।। ফোন কেটে যাবার পর, মনে হলো জাহিদ ভাইয়ের কি বিপদ কে জানে, আর এখানেও তো বিশাল এক ঝামেলা লেগে আছে।

সাইফুল আমার হাত শক্ত করে ধরে বললো- চল, এখান থেকে যাই, সবকিছু পরে দেখবো।।

আমিও হতভম্ব হয়ে আছি, সামনে সাইফুলের বউ কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।। তাসনুভা খুব অবাক চোখে আমাকে বিদ্ধ করছিলো, গার্ড এসে তাসনুভা আর রুনার পাশে রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে।।

আমি সাইফুলের বাহু থেকে হাত ঝাঁকি দিয়ে ছুটিয়ে, বললাম- দাঁড়া বেটা, এখানেই ফয়সালা হোক।। তারপর তাসনুভার দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে বললাম- আচ্ছা, আপনি একটু বলবেন, পুরো ঘটনা, আপনি কি জানেন আপনার পাশে এই মেয়েটার স্বামী যে আমার পাশে দাঁড়ানো।।

তাসনুভা আমার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে রুনার দিকে তাকিয়ে বললো- তাই নাকি ফেন্সী?? এটা তোর জামাই??

আমি আর সাইফুল মুখ চাওয়া চাওয়ি করলাম, রুনাকে উনি ফেন্সী নামে ডাকছেন কেনো!! রুনার দিকে তাকিয়ে আছি, কি জবাব দেয় শোনা দরকার।। আসলে সবকিছু খুব দ্রুত ঘটে যাচ্ছে, মস্তিষ্কের আরেক অংশ ব্যস্ত জাহিদ ভাইকে নিয়ে।।

রুনা কোন কথা বললো না, দুই হাত দিয়ে মুখ আড়াল করে, যেদিন থেকে এসেছে সেদিকে ছুটে পালালো।। আমি আর সাইফুল আরেকদফা বিষম খেয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।।

তাসনুভা এবার আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললো- আপনারা একটু বসেন, আমি আসছি, আমি এসে কথা বলছি।।
বলেই উনিও যে পথে রুনা গিয়েছে সেই পথের দরজা ঠেলে হারিয়ে গেলো।।

গার্ড আস্তে করে সরে তার জায়গায় চলে গেলো।। আমি সাইফুলকে বললাম- চল বসি, দেখি কি হয়!!

সাইফুল অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমার কথা মেনে নিলো।। আমরা আবার সোফায় বসে পড়লাম, আমি ফোন থেকে একটু আগে আসা নাম্বারে কল দিলাম, জাহিদ ভাইয়ের ব্যাপারটা তো বুঝতেছি না।। ওদিকে মনে হচ্ছে, আরাফাত শাফাত হয়তো ওই ছেলেটার ইন্টারভিউ নিচ্ছে, তারা রিসিপশনে ঘটে যাওয়া ঘটনার কিছুই জানে না।।ওই নাম্বার বন্ধ, বার কয়েক চেষ্টা করে দেখলাম, না একই কথা নাম্বার বন্ধ!!

সাইফুলকে খুব অস্থির দেখাচ্ছে, সে স্থির হয়ে বসে থাকতে পারছে না।। একবার আমার দিকে তাকাচ্ছে, তো আরেকবার ওই দরজার দিকে যেদিক দিয়ে তাসনুভা আর রুনা চলে গেছে।।

সাইফুলের হাঁটুতে একটা হাত রেখে বললাম- দোস্ত, ঠান্ডা হ, ব্যাপার না, এই মেয়েকে তালাক দিবি এই তো।। এত চিন্তার কি আছে, আমি তোর সাথে আছি, কিন্তু জাহিদ ভাইয়ের কলটা আমাকে খুব ভাবাচ্ছে।।

এরমধ্যে শাফাত ওই ছেলেকে নিয়ে রিসিপশনে আসলেন, যে ছেলে ইন্টারভিউ দিচ্ছিলো।। সে আমার দিকে এমন একটা অহংকারী চাহনি দিলো, আমি বুঝে নিলাম।। কোম্পানির মালিকের বোনকে বিয়ে করার প্রস্তাব পেয়ে, বেচারা এখন আকাশ দিয়ে উড়ছে।। এমন একটা ভাব যে, সে এখন আকাশ থেকে আমার দিকে থুতু ছিটাবে আর বলবে, দেখ ব্যাটা জব নাকি পাবো না, মালিকদের বোনকে বিয়ে করার প্রস্তাব পাইছি।

শাফাত একটু অদ্ভুত চোখে আমাদের দিকে তাকালেন, উনি হয়তো এখনও আমরা বসে আছি, এটা আশা করেন নি।। আমিও পাত্তা না দেবার ভান করে বসে আছি, শাফাত ওই ছেলেকে নিয়ে সেই দরজা ঠেলে চলে গেলেন, আমি ভাবলাম এখন কি তাসনুভা এই ছেলের ইন্টারভিউ নিবে, ওখানে তো মনে হয় রুনাও আছে।। 

সাইফুল আমার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টিয়ে বললো- ভাইরে হইতাছে কি, কই আইলাম, আজব কাহিনী।। আমার বউ এইখানে, তোর জাহিদ ভাই এইখানে আইসা গায়েব, আবার একটার পর একটা লোক যায়, কই যায়!!

আমি একটা কৃত্রিম হাসি দিয়ে বললাম- জানি না রে ভাই, আমারও মাথা ঘুরতাছে।। কোন দুঃখে যে এইখানে জবের জন্য আসছিলাম, কি যে হচ্ছে সত্যি আমিও বুঝতে ব্যর্থ।।

শাফাত খানিক বাদেই ছেলেটাকে নিয়ে ফিরে আসলেন রিসিপশনে, ছেলেটার চেহারা এবার পুরো উল্টা, সে কেমন আড়ষ্ট হয়ে মুখ লুকাচ্ছে।। ছেলেটা দেখলাম, আস্তে করে মেইন দরজা ধরে অফিস থেকে বের হয়ে যাচ্ছে।। শাফাত সাহেব আমাদের কাছে এসে বললেন- চলেন আমার সাথে।।

আমার এবার একটু ভয় হচ্ছিলো, সাইফুলের মনে কি চলে কে জানে।। দু’জন উনাকে অনুসরণ করলাম, উনি সেই দরজা খুলে প্যাসেজ ধরে একদম অন্তিম দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন।। তারপর দরজায় আলতো টোকা দিয়ে বললেন- তাসনুভা ম্যাম, উনারা এসেছেন।।

দরজা খুলে গেলো, আমাদের ভিতরে ঢুকতে বলা হলো, শাফাত দরজা থেকেই ফিরে যাচ্ছে আগের পথ ধরে।। আমি আর সাইফুল রুমে ঢুকলাম, রুমটা আমার বড্ড অচেনা লাগছে এখন।। মনে হচ্ছে এখানে আমি কোনদিন আসি নি, অথচ বাস্তবতা হলো, দিনকয়েক আগে একবার এসেছিলাম তো।।
সোফায় গিয়ে আমি আর সাইফুল বসলাম, বিপরীত সোফায় তাসনুভা বসলো, কোথাও রুনাকে দেখতে পেলাম না।। সাইফুল রুমের চারপাশে তাকাচ্ছে।। রুমের অন্যদিকে আরও দুটো দরজা আছে, আরও রুমে যাবার ব্যবস্থা হয়তো, কে জানে।।

তাসনুভা খুক্‌ করে কেশে বললো- আচ্ছা, আপনি তো সাইফুল, মানে ফেন্সীর হাজব্যান্ড??

আমি তাসনুভার কথা কেড়ে নিয়ে বললাম- আপনি রুনাকে ফেন্সী কেন ডাকেন??

তাসনুভা একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বললো- আমাদের এখানে আসল নাম আমরা ব্যবহার করি না, ওর নাম রুনা আমি তো প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম।। যাই হোক, আমি আপনাদের সব ভেঙে বলছি, দেখুন তারপর আপনারা কি করবেন??

সাইফুল তাসনুভার কথা শেষ হতেই বললো- রুনা কই?? ওকেও ডাকুন??

তাসনুভা জবাব দিলো- রুনা আছে ভিতরে, সে আপনার সামনে আসতে লজ্জা পাচ্ছে।। আমি একটু খুলেই বলি, পুরো ব্যাপারটা, ওকে, এখানে আমি কোন লুকোছাপা রাখবো না।।

আমি আর সাইফুল আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছি, তাসনুভা বলতে শুরু করলেন- ফেন্সী আমাদের এখানে কাজ করে আজ প্রায় তিন বছর ধরে।। কি কাজ সেটা বলছি, দেখেন আমাদের এই কাজ আমরা খুব গোপনীয়তার সাথেই করি, তবে এখানে থানা পুলিশ ম্যানেজ আছে, বড় বড় হোমরা চোমরাদের সাপোর্ট আছে।। ফেন্সী মূলত তিন বছর আগে ওর এক বান্ধবীর মাধ্যেম আমাদের সাথে যুক্ত হয়, আমাদের অনেক ইয়াং মেয়েও লাগে ব্রোকারিং এর কাজে।।

আমি তাসনুভাকে বললাম- ইয়াং মেয়ে দিয়ে আপনারা কি করেন, আপনারা না মেইল এস্কর্টের কাজ করেন।। আবার কি মেয়েদের দিয়েও এসব করান??

-আরে না না, আপনি বুঝেন নাই।। আচ্ছা সহজে বলছি, ধরেন আমাদের এই এজেন্সীর কথা তো আমরা ওভাবে বিজ্ঞাপন দিতে পারি না।। তবে এসবের বাংলাদেশে এখন প্রচুর চাহিদা, কিন্তু তারা তো এই এজেন্সীর নাম ধাম বা এমন কিছু আছে তা জানেই না।। তখন এই ইয়াং মেয়েগুলো আমাদের বিজ্ঞাপনের কাজ করে।। ওরা ভালো অংকের টাকা পায়, ধরেন ওরা ফেসবুকে বা বিভিন্ন ওয়েব সাইটে কিংবা সরাসরি নানাধরণের মহিলাদের সাথে কথা বলবে।। আস্তে আস্তে তাদের পরিবারিক খোঁজ নিবে, একসময় ব্যক্তিগত বিষয় জানতে চেয়ে বুঝবে যে এদের কারও এমন আসক্তি আছে কিনা, মানে মেইল এস্কর্টের দরকার কিনা।। থাকলে সোজা এখানে পাঠাবে, এখানে এসে সে আমাদের এস্কর্টদের ছবি বায়োডাটা দেখে বাছাই করে নিবে।। আসলে আমাদের এখানে কোন ছেলে কাজ করতে রাজী হলে, পরে আমরা তার ফুল বডির কিছু ন্যুড ছবি, আর পুরো যাবতীয় বডি মেজারমেন্ট দিয়ে আলাদা বায়ো তৈরি করি।।

আমি ভ্রু কুঁচকে সাইফুলের দিকে তাকালাম, এটা বোঝার জন্যে সাইফুল কি ভাবছে রুনাকে নিয়ে।। সাইফুল ভাবলেশহীন ভাবে বসে আছে।। ওর কিছু শুনতে আর চমকাচ্ছে না।।

আমি তাসনুভাকে বললাম- আচ্ছা, তো ভালো কথা, আপনি সাইফুলের বাসায় গিয়েছিলেন কেনো, আর কাকে নিয়ে গিয়েছিলেন??

তাসনুভা একদম বিস্মিত আমাদের কথা শুনে, একটা মাইনর ধাক্কা খেলো মনে হচ্ছে, তারপর জড়ানো কণ্ঠে বললো- এসব কি ফেন্সী আপনাদের বলে দিছে নাকি, আসলে আপনারা জানেন কিভাবে?? আমার সাথে আমার একজন ইমপ্লোয়ি ছিলো।।

আমি উপহাসের হাসি হেসে বললাম- আরে ম্যাম, আমরা এখন এই জেনারেশনের পোলাপান, সাইফুলের বাসার ড্রইং রুমে স্পাই ক্যাম লাগানো আছে বুঝলেন।। ইভেন আপনি নাকি রুনাকে মারতেও গেছিলেন, এসবের কারণ কি??

তাসনুভা কিছুটা আহত গলায় বললো- আসলে ফেন্সী খুব একটিভ ছিলো আমাদের কাজে, ওর দ্বারা অনেক ক্লাইন্ট আসতো।। আচমকা শুনি চার-পাঁচ মাস আগে ওর বিয়ে, দ্যান আমরা ওকে চাপ দেই যে এখন বিয়ে করো না।। কিন্তু পারিবারিক কারণে তাকে বিয়ে করতে হবে, পরে আমরা শর্ত দিলাম, আচ্ছা বিয়ে করো সমস্যা নাই, কিন্তু বিয়ের পর একটু সামলে নিয়ে এই কাজ আবার শুরু করতে হবে।। ফেন্সী শুরুতে স্বীকার করলেও, বিয়ের পরে বেঁকে বসে।। ক’দিন ধরেই ওকে চাপ দিচ্ছিলাম, সত্যি বলতে কারণ আমাদের অন্যতম একটিভ ব্রোকার সে ছিলো।। পরে ওকে ব্ল্যাকমেইল করি যে, তোমার হাজব্যান্ডকে সব বলে দিবো, দ্যান ও নতুন বাসার ঠিকানা দিলো, আমরা গেলাম, সেখানেই আর কি কথাকাটাকাটি পরে সে আসলে ভয়েই রাজী হয়।। আসলে, আমি বলবো মেয়েটা বিয়ের পর আর এসব করতে চায় নি।। আর আমি এটা বলতে পারি, ও আসলে ব্রোকারের যে কাজ করতো সেটা টাকার প্রয়োজনেই করতো।। অনেক মেয়ে আছেন যারা দিনের পর দিন যৌন চাহিদা থেকে বঞ্চিত, কিন্তু কোনদিকে যাবার সুযোগ নেই তারাই আসলে আমাদের ক্লায়েন্ট।। আসলে দেখেন পুরুষের জন্যে প্রকাশ্যে লাইসেন্সধারী ব্রথেল বা পতিতালয় আছে।। ভাবখানা এমন সমস্ত যৌনতা পুরুষের, মহিলাদের যেনো কিছুই নেই।। যাস্ট আমরা এই পলিসিকেই কাজে লাগাই, আপনাকে আমি স্বেচ্ছায় ফেন্সীর সব গোমড় বলে দিলাম।। এবার আপনি সিদ্ধান্ত নেন, এই মেয়ের সাথে আপনি লাইফ চালিয়ে নিবেন কিনা!! তবে একটা কথা দিতে পারি, আমরা আর ঝামেলা করবো না, ইভেন কেউ জানবেও না কিছু।।

আমি সাইফুলের দিকে তাকালাম, ছেলেটা গভীর চিন্তামগ্ন, আবার ওকে গাধার মত দেখাচ্ছে।। আমি বললাম- রুনা কই, ওকে কি ডাকা যায়??

তাসনুভা বললো- আছে বললাম না, ভিতরের রুমেই।। অনেক লজ্জিত সে, আমি অনেক বুঝালাম, সে হাউমাউ করে কান্না করছিলো।। আচ্ছা আমি ডেকে আনছি।। বলে তাসনুভা উঠে ভিতরের দিকে গেলেন, ওদিকের একটা দরজা ঠেলে ঢুকে আবার ধাক্কা দিয়ে দরজা চাপিয়ে দিলেন।। 

আমি সাইফুলের দিকে ঘুরে তাকিয়ে বললাম- কি করবি দোস্ত, জীবন এত এমন কেন, এইসব তো কল্পনার বাইরেই ছিলো আসলে।।

সাইফুল ক্রোধ ঝেড়ে বললো- বা**ল করুম।। মা**গ রে সোজা তালাক দিমু, বেটা দালাল নিয়া আমি সংসার করমু নাকি, তুই আবার জিজ্ঞেস করিস কোন আক্কেলে, কি করুম!!

আমি চুপ করে রইলাম, আসলেই একটা বিবাহিত পুরুষের স্ত্রী যদি এমন চরিত্রের বের হয় কি করার আছে।।

দরজা খুলে তাসনুভা এক প্রকার টেনে রুনাকে নিয়ে আসছে।। রুনা একদম মাথা নিচু করে গুটিগুটি পায়ে হাঁটছে।। আমি বুঝতে পারছি, মেয়েটার মধ্যে প্রচণ্ড লজ্জা ভর করেছে।। আসলে সে তো বিয়ের পর এসব করতেও চায় নি, এই জন্যে অন্তত তার প্রতি একটা মায়া জন্মেছে আমার।

রুনা হঠাৎ করে এসে, নিচু হয়ে সাইফুলের পা জাপটে ধরে হাউমাউ করে কান্না করে দিলো।। সাইফুল ঘটনার আকস্মিকতায়  বিব্রত।। সাইফুল বেশ নমনীয় গলায় বললো- উঠো, আচ্ছা উঠো, বাসায় চলো।।

রুনা অঝোরে কেঁদে যাচ্ছে, ভাঙা ভাঙা গলায় বললো- শুনো আমাকে তালাক দাও, যা খুশি করো, তোমার পায়ে ধরি এই কথা আমার বাবা মাকে বইলো না।। আল্লাহ্‌র দোহাই লাগে, আমার বাসার কাউরে এইসব বইলো না।। আমি তোমার কাছে কোন দাবী রাখবো না, দেনমোহর চাইবো না, কিচ্ছু না, শুধু কাউরে বইলো না, প্লিজ সাইফুল প্লিজ।।

আমার চোখ কেনো যেনো সিক্ত হয়ে যাচ্ছে, দেখলাম তাসনুভার চোখেও জল।। সাইফুল একপ্রকার টেনে রুনাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো।। রুনা ঝপ করে সাইফুলের শরীর জাপটে ধরে সেই একই কথা বলে বলে বিলাপ করছে।। তাসনুভা এগিয়ে এসে রুনার পিঠে হাত রেখে বললো- ফেন্সী কান্না করো না, আমার বিশ্বাস তোমার এই কথা উনি কাউকে জানাবে না।। ফেন্সী আমি সরি ফেন্সী, আমাকে ক্ষমা করে দিও।।

সাইফুলের এবার নিজেকে রুনার কাছ থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করতে করতে বললো- থামো রুনা থামো, এখন বাসায় চলো, প্লিজ কান্না করো না, কোন লজ্জা নেই।। আমরা পুরুষরা পতিতালয় থেকে এসে বউকে নিয়ে শুতে নূন্যতম লজ্জা পাই না, আর তুমি তো কেবল মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছো।। চলো রে বাবা, চলো।।

রুনার কান্না আরও বেড়ে গেলো!! সাইফুল তাকে ছাড়াতে যায়, সে আরও জোরে জাপটে ধরে।। আমি মনে মনে ভাবছি চলুক না এভাবে কিছুক্ষণ, ভালোই তো লাগছে।। আমি জানি না সাইফুল কি করবে, হয়তো তালাক দিয়েই দিবে, আমি হলে হয়তো দিতাম না।। জগতের মেয়েগুলো যতই মন্দ বা ভালো চরিত্রের হোক, এদেরকে বিধাতা পুরুষের মনকে বিগলিত করার অদ্ভুত ক্ষমতা দিয়ে পাঠিয়েছে।। আমি খুব সহজে বিগলিত হই!!
………………

ওই অফিস থেকে সাইফুল এক প্রকার জোর করে আমাকে আবার ওর বাসায় নিয়ে এসেছে।। রুনা যতটা না সাইফুলের সামনে যেতে লজ্জা পাচ্ছে, তার চেয়ে বেশি লজ্জা পাচ্ছে, আমার সামনে আসতে।। আমি আসার পথে, এমনকি এখানে বসেও জাহিদ ভাইয়ের কল দেয়া সেই নাম্বারে কল দিয়ে যাচ্ছি।। কিন্তু সেই একই ভবের গীত, নাম্বার বন্ধ, নাম্বার বন্ধ!! আমি ভাবলাম, এবার অন্তত পুলিশের কাছে যাওয়া উচিত, কি করবো কই যাবো কই খুঁজবো তাকে চিন্তায় ভালো লাগছে না।। সাইফুলকে বললাম- দোস্ত, চল পুলিশের কাছে যাই, জাহিদ ভাইয়ের ব্যাপারটার একটা বিহিত করতে হবে তো নাকি!!

-দোস্ত, দেখ তো উনার ফেসবুক থেকে উনার পরিচিত কারও নাম্বার বা বন্ধু বান্ধবের আইডি পাস কিনা??

আমি ভাবলাম তাই তো ভালো আইডিয়া, আমি ফেসবুকে ঢুকলাম, আসলে জাহিদ ভাইয়ের সাথে আমার ফেসবুকে এড নাই।। আমি ব্যাচেলর সাধারণত যে বাসায় থাকি, তাদের কারও সাথে এড থাকার ইচ্ছে করে না।। আইডি সার্চ দিলাম, পেলামও উনার আইডি, কিন্তু সবচেয়ে বিদঘুটে ব্যাপার উনার মত একজন লোকের আইডি লক করা, ভাবা যায়।। এত চিন্তার মধ্যেও ফিক করে হেসে দিয়ে সাইফুলকে বললাম- আচ্ছা দোস্ত, পোলা মানুষ আইডি লক করে রাখলে, কেমন লাগে বল??

-কেন কার আইডি লক করা, তোর জাহিদ ভাইয়ের। আইডিতে একটা সোনা দুইটা দানা আছে তাই লক করা, আজাইরা ভাব আর কি।।

আমি সাইফুলের রসিকতা ধরতে পেরে হেসে নিলাম- হ, বুঝ আইডি লক, না জানি কি আছে।। আচ্ছা দাঁড়া তমালকে একটা কল দেই তো।। ওর সাথে এড থাকতে পারে।।

হুম, তমালের সাথে কথা হলো।। তমালের সাথে এড আছে, একটা ভালো ব্যাপার হলো, তমাল এখন অফিসের একটা কালেকশনের কাজে মালিবাগ রেলগেটে।। আমিও আছি খিলগাঁও সিপাহীবাগ, খুব একটা আহামরি দূরত্ব না।। আমি তমালকে তালতলা মার্কেটে আসতে বললাম, আইডি ঘেঁটে তারপর প্রয়োজনে থানায় গিয়ে কথা বলা যাবে।।

সাইফুল আমার সাথেই আছে, তমালের সাথে দেখা হতেই দেখলাম, ও অনেক কৌতুহল নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।। ওর অনেক জিজ্ঞাসা, কেনো এভাবে আমি ওকে এখানে আসতে বললাম, তারমধ্যে সন্ধ্যা হয়ে গেছে প্রায়।। আমি তমালকে বললাম- জাহিদ ভাইয়ের আইডিতে ঢুকো তো।।

তমাল ঢুকতে গিয়ে বললো- ভাই নেট নাই, ফ্রি নেট দিয়া ঢুকবো কি।। আমি ওকে হটস্পট দিলাম, এবার জাহিদ ভাইয়ের আইডিতে গেলাম।।

খুবই সাদামাটা আইডি, জাহিদ ভাইয়ের তেমন স্ট্যাটাস নেই।। তেমন করে লাইক কমেন্ট নেই, আমি তবুও বিভিন্ন পোস্টের কমেন্ট ঘাঁটতে থাকলাম, দেখি ভাই বন্ধু এমন কাউকে পাই কিনা।।

ফোন স্ক্রল করতে করতে, একটা জায়গায় এসে চোখ আটকে গেলো, একটা আইডি থেকে কমেন্ট করা, স্যার আজকে কখন পড়াতে আসবেন?? সেখানে আবার জাহিদ ভাই উত্তর দিয়েছেন- সন্ধ্যায়।। যাক্‌ একজন পরিচিত কাউকে পেলাম, এটা মনে হয় উনার কোন ছাত্রীর আইডি, নাম সুমাইয়া ইসলাম।। আমি যতদূর জানি, জাহিদ ভাই এদিক ওদিক বেশ কয়েকটা টিউশানি করাতেন, পরে মনে হয় বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন।। আমি ওই আইডিতে ঢুকলাম, দেখাচ্ছে মেয়ে মনিপুর স্কুলে পড়ে, মেয়ের চেহারা আল্ট্রা মর্ডান টাইপের মনে হলো।। তমালের আইডি থেকে সুমাইয়া ইসলামের আইডিতে একটা নক দিলাম এটা লিখে- হ্যালো সুমাইয়া, আপনি কি জাহিদ নামে কাউকে চিনেন, উনি হয়তো আপনাকে পড়াতেন।। উনার ব্যাপারে একটু কথা বলার ছিলো।।

ম্যাসেজ দিয়ে বসে আছি, তমাল অবাক চোখে তাকিয়ে আছি।। জাহিদ ভাইয়ের আইডি আরও ঘাঁটাঘাঁটি করে যাচ্ছি।। কোন আত্মীয় স্বজন পেলে বেশি ভালো হয়, না ওমন কাউকেই পেলাম না।। স্যার ছবিটা সুন্দর হইছে এমন একটা কমেন্ট পেলাম, এটা মনে হলো আরেকটা ছাত্রীর হতে পারে।। এই আইডির নাম সিনথিয়া শিকদার।। এটা আবার লক করা আইডি, ম্যাসেজও দেয়া যায় না।। অগত্যা ব্যর্থ হয়ে, আমি এই ফাঁকে ফোন বের করে, জাহিদ ভাই যে নাম্বার থেকে কল দিয়েছিলো, ওই নাম্বারে কল দিলাম, না এখনো বন্ধ!! তালতলা মার্কেটের সিঁড়িতে বসে আছি, সবকিছু তালগোল পাকিয়ে গেছে।। এমন সময় ওই সুমাইয়া ইসলাম আইডি থেকে রিপ্লাই পেলাম।। মনে হলো, পানিতে ডুবন্ত আমি আঁকড়ে ধরার কিছু একটা অবলম্বন পেলাম।।

জবাব এলো বাংলিশে এমন- কে আপনি, স্যার তো এখন আমাকে পড়ান না।।

আমি লিখলাম- ঠিক আছে, আসলে আমি উনার সাথে একই বাসায় থাকি, উনার কোন খোঁজ নেই আজ তিনদিন ধরে, নাম্বার সব বন্ধ।। ভাবলাম, উনার কোন আপডেট বা কোনকিছু যদি পাই।।

ওএমজি, কি বলেন, আচ্ছা স্যারের পরিচিত ওভাবে আমি কাউকে চিনি না। ওয়েট ভাইয়া, আমি দেখতেছি কি করা যায়।।

আমি লিখলাম- আপনাকে কি ম্যাসেঞ্জারে একটু কল দিতে পারি, প্লিজ আর্জেন্ট।।

কোন জবাব এলো না, খানিক সময় পরে মেয়েটাই কল দিলো।। আমি রিসিভ করে বললাম- হ্যালো, আমি শোভন বলছিলাম, মানে জাহিদ ভাইকে নিয়ে আসলেই আমরা চিন্তিত।।

মেয়েটা বললো- আপনার নাম না তমাল দেখলাম, আপনি কি ফাইজলামী করছেন, যদিও আমি স্যারের নাম্বারে কল দিছিলাম এখুনি, স্যারের নাম্বার অফ।।

আমি একটু অবাক হলাম, আজকালের মেয়েরা যথেষ্ট সতর্ক দেখা যায়।। আমি বললাম- সুমাইয়া আপনি ভুল বুঝবেন না, আসলে আমরা তিনজন এক বাসায় থাকি, এই তমাল আমি শোভন আর জাহিদ ভাই।। আমি তমালের আইডি দিয়েই আপনার সাথে কথা বলছিলাম আর কি, জাহিদ ভাইয়ের ব্যাপারে কোন তথ্য কি দিতে পারেন, যেমন তার আব্বা আম্মার নাম্বার বা কোন পরিচিত লোকের।।

-সরি ভাইয়া, আমি এমন কিছু জানি না।। আম্মু জানতে পারে, নট সিওর, বাট আম্মু তো বাইরে।।

আমি হন্তদন্ত হয়ে বললাম- আসলে আপু খুব আর্জেন্ট, আপনার আম্মুকে একটু কল দিয়ে জিজ্ঞেস করবেন উনি কিছু জানেন কিনা??

-ওকে ভাইয়া, হোল্ড, আমি আম্মুকে কল দিচ্ছি।। লাইন কাটতে হবে না, আমি ল্যাপটপ থেকে লাইনে আছি, আমি যাস্ট আম্মুকে কল দিচ্ছি।।

আমি অধীর অপেক্ষা করছি, ওপাশে মেয়েটার ক্ষীণ কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে।। আমি কান পেতে আছি- হ্যালো, আম্মু তুমি বাসায় কখন আসবা??

নীরবতা-

আচ্ছা শুনো না, তুমি কি জাহিদ স্যারের আব্বু আম্মুর বা উনার পরিচিত কারও নাম্বার জানো??

বেশ নীরবতা-

না শুনো না আম্মু, শোভন নামের একজন বললো স্যারের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।। তাই আর কি…

নীরবতা-

আচ্ছা!! তুমি তাড়াতাড়ি আসো, আর আইসক্রিম ডোন্ট ফরগেট।।

ফোন রেখে মেয়েটা আমাকে উদ্দেশ্য করে বললো- হ্যালো ভাইয়া আছেন??

আমি বললাম- হুম আছি, বলুন, আন্টি কি বললো??

-না আম্মু তো উল্টা বকা দিলো, আমি কার সাথে না কার সাথে কথা বলছি এটা ভেবেই আম্মু অস্থির।। ওয়েল আমাদের বাসায় শুধু নানু আম্মু আর আমি থাকি সো আর কাউকে জিজ্ঞেস করতে পারছি না, সরি।।

আমি বললাম- ইটস্‌ ওকে।। মানে আন্টির কাছে জাহিদ ভাইয়ের কারও নাম্বার নেই।। আচ্ছা রাখি তাহলে আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।। তবে তো এবার পুলিশের কাছেই যেতে হবে।।

-হ্যালো, ভাইয়া শুনেন, প্লিজ আমাকে আপডেট জানায়েন।।

ওকে ওকে।। বলে ফোন কেটে দিলাম।। শালার, আজকালের মেয়েরা কি যে ঢঙ করে কথা বলে, এই মেয়ে যেহেতু স্কুলে পড়ে, যদি ক্লাস টেনেও পড়ে ধরি সর্বোচ্চ বয়স ১৬ হবে, অথচ কথার স্ট্যাইল দেখলে মনে হবে, পুরা চাবাইয়া চাবাইয়া কথা বলতেছে।। 

আমি সাইফুলের দিকে তাকিয়ে বললাম- চল তো গুলশান থানায় বা মিরপুর থানায় একটা মিসিং ডায়রি করে আসি, আর ফোনকলের কথা জানিয়ে আসি।।

সাইফুল একটু ক্লান্ত সুরে বললো- দোস্ত, আজ না, রাত হইছে, আমি বাসায় যাই।। কাল অফিসের পরে বিকেলে তোর সাথে থানায় যাবো নে।। তুই আর তোর ছোট ভাই তমাল, তোরা আজ বাসায় যা।।

আমি ভেবে দেখলাম তাই তো, তমাল বিভিন্ন প্রশ্ন করতে চাচ্ছে, ওকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিলাম।।

আরো পড়ুন : রূপোপজীবি | প্রথম পর্ব 

আরো পড়ুন : রুপোপজীবি | দ্বিতীয় পর্ব


………………
বাসায় ঢুকে চক্ষু চড়কগাছ, দেখি জাহিদ ভাই।। একদম বিধ্বস্ত মলিন ভয়ার্ত এক চেহারা, আমাদের দেখে ভাবলেশহীন ভাবে একটু বাদে বাদে পানি খাচ্ছেন।। আমি আর তমাল বিস্ময় কণ্ঠে- আরে জাহিদ ভাই, কই ছিলেন, কই থেকে আসলেন?? ভাই এই হাল কেন আপনার??

জাহিদ ভাই কথা বলছেন না, উনার মুখে কোন কথা নেই।। আমি আর তমাল মুখ চাওয়া চাওয়ি করলাম, আমি তাগাদা দিয়ে বললাম- ভাই আপনাকে তো ডাক্তার দেখানো উচিত, আপনার তো চেহারার বেহাল দশা।। ভাই কই ছিলেন, কি কাহিনী বলেন তো!! ভাই!!

জাহিদ ভাই কথায় জোর পাচ্ছেন না, দুইবার কথা শুরু করতে গিয়ে থেমে গেলেন, আবার দম নিয়ে নিচু গলায় বললেন- ভাই, জানে বাঁইচা আছি ভাই এইডাই খোদার কাছে শুকরিয়া।। আমারে তো ভাই মাইরাই ফালাইতো, কেন বাঁচাই রাখছে, আবার কেন ছাইড়া দিলো কে জানে।।

আমি খুব আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করলাম- কে ছাইড়া দিলো ভাই, ভাই কিছু খাইছেন।। খান তারপর কথা বলেন।। আমি তমালের দিকে তাকিয়ে- ওই তমাল, যাও তো নিচ থেকে ভাত মাছ কিছু নিয়ে আসো, আমি মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করতে যাবো।। জাহিদ ভাই আমাকে থামিয়ে বললো- খাইছি ভাই, খাইছি।। আমি যে নিজের বাসায় আসছি এইটাই বিশ্বাস হচ্ছে না রে ভাই, আমি জীবনের আশা ছাইড়া দিছিলাম ভাই, একদম ছাইড়া দিছিলাম।।

আমি দরদী গলায় বললাম- ভাই থাক, আপনে রেষ্ট করেন, আপনার কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে।। পরে সব শুনবো নে, আপনি ভাই খাইছেন তো, তাইলে ঘুমান একটু, লাইট অফ করে দেই ঘুমান।। তমাল লাগলে আজ আমার সাথে থাকবে নে।। ওই তমাল আমার রুমে চল।। জাহিদ ভাই কিছু একটা বলতে যাবেন, উনাকে এক প্রকার জোর করেই বিছানায় শুয়ে দিলাম।।

রুমে এসে ঝিম মেরে বসে আছি, সাইফুলকে কল করে জানালাম সব।। সাইফুল অবাক হয়ে কৌতুহল দেখাচ্ছে, আমি বেচারাকে জানালাম, আমি নিজেই ধাঁধার মধ্যে আছি।। 

আমি আর তমাল এসব নিয়েই আলাপ করছিলাম, দেখি আস্তে আস্তে জাহিদ ভাই আমাদের রুমে আসলেন।। আমি কিঞ্চিত রাগ দেখিয়ে বললাম- ভাই আপনি আবার এখানে আসলেন কেন, ঘুমালে ভালো হতো না।।

– না রে ভাই, অন্ধকার ভয় লাগতাছে এখন।। শুনেন ভাই, আপনাকে একটা কথা বলি, আমারে আজ রাইতে নিশ্চিত মাইরা ফালাইতো, কেন মাইরা ফালাইতো জানি, কাউকে বলা যাবে না, কিন্তু কেনো ছাইড়া দিছে জানি না।। ওখানের লোক এসে আমারে বাসায় দিয়ে গেছে।। আমি খালি বলি, আজকে আপনেরে কিভাবে যে কল দিছিলাম, আমার বড় ফোন টোন তো সব কাইড়া নিছে, ছোট ফোনডা দেখে কিন্তু ঐটার চার্জ ছিলো না।। কয়েকবার ফোনটা ওপেন করার চেষ্টা করলাম, আচমকা দেখি ওপেন হইলো, পরে তো আপনাকে ফোন দিলাম, কথা বলতে না বলতেই ফোন অফ।। আর ভাবলাম বাঁচার আশা শেষ।। ওই অফিস ভালো না রে ভাই, ওই অফিস থিকা আমারে ওরা চোখ বাঁইন্ধা নিয়া কই যে এক বস্তিতে আটকাই রাখছিলো কে জানে।। আমারে মাইরাই ফালাইতো ভাই, কিন্তু ভাই কেন ছাইড়া দিলো আমি জানি না।।

তমাল আমাকে ধাক্কা দিয়ে বললো- ভাই ফোন বাজে তো আপনার।।

আমি আসলে জাহিদ ভাইয়ের কথার মধ্যে বুঁদ হয়ে ছিলাম।। ফোন ধরলাম, অপরিচিত নাম্বার, শুধু হ্যালো বলার সাথে সাথেই ওপাশ থেকে এক মহিলা কণ্ঠ বলে গেলো- শোনেন শোভন, আপনি কিভাবে আমার মেয়ের সাথে যোগাযোগ করেছেন আমি জানি না।। যাই হোক, ভবিষ্যতে আর যোগাযোগ করবেন না।। শুধু আমার মেয়ে আমার আসল পরিচয় জেনে যেতে পারে জন্যে, আমি জাহিদকে মেরেই ফেলতে চেয়েছিলাম।। কারণ, আমার হাজব্যান্ড নেই, এই মেয়েটা ছাড়া আমার কেউ নেই, আমাকে তাই ওকে নিয়েই বাঁচতে হবে।। যাক্‌ আমার মেয়ে পর্যন্ত যেহেতু পৌঁছে গেছেন, আমাকেও হয়তো ধরে ফেলতেন, তাই জাহিদকে ছেড়ে দিলাম।। জাহিদকে ওয়ার্নিং দেয়া আছে, আশা করি সে আর মুখ খুলবে না, আর আপনিও ওকে বলে দিয়েন।। আর হ্যাঁ, আমাদের এই জগত সম্পর্কে যা জানেন এখন ভুলে যান, না ফেন্সী, না আপনার ওই বন্ধু, না জাহিদ কাউকে আমরা জড়াবো না।। আর আপনারাও আমাদের ঘাঁটতে আসবেন না।। ব্যাস!!

আমি কিছু বলতে যাবো, ওপাশ থেকে ফোন কেটে দিলো।। আমি নিজে নিজে কিছু হিসাব মিলাতে থাকলাম, তবে কি এমন কিছু, এই জাহিদ ভাই তাসনুভার মেয়েকে পড়াতেন, তো তাসনুভাকে চেনাটাই স্বাভাবিক।। পরে যখন ওই অফিসে গিয়ে তাসনুভাকে দেখলেন, তাসনুভা নিজের পরিচয় তার মেয়ের কাছে ফাঁস হবার ভয়ে জাহিদ ভাইকে আটকিয়ে রাখলেন, এমনকি পরে সময় সুযোগ মত লোক দিয়ে মেরেও ফেলতেন।। ওই অফিসের আরাফাত শাফাত জাহিদ ভাইয়ের খোঁজ করছি শুনেও, ঠান্ডা মাথায় আমার সাথে এমন ব্যবহার করলো, নূন্যতম সন্দেহ করার সুযোগ পেলাম না।। মনে হলো, উল্টো আমাকেই জাহিদ ভাইকে খুঁজতে সাহায্য করছে, কি নিঁখুত অভিনয়।।
দিনশেষে, শুধু একটা ম্যাসেঞ্জারের ফোন কল, একটা মানুষের জীবন বাঁচিয়ে দিলো।। কি বিচিত্র এক জীবনের গল্প!!

জাহিদ ভাই বিড়বিড় করে বলে যাচ্ছেন- ভাইরে মাইরাই ফালাইতো, কেন যে ছাইড়া দিলো কে জানে।। কেন যে ছাড়লো, কে জানে।।

আমি জাহিদ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে একটা রহস্যময় হাসি দিয়ে বললাম- ভাই, আপনার ছাত্রী সুমাইয়ার চেহারাটা কিন্তু সেইরকম সুন্দর।। আমার সাথে প্রেম করাই দিবেন??

……………
সমাপ্ত!!