রুপোপজীবি | দ্বিতীয় পর্ব

একটা  বাজে চাকুরীর অফার পেলাম, মেইল এস্কর্টে কাজ করার।। মেইল এস্কর্ট হলো এক ধরণের পুরুষ পতিতা, যারা বিভিন্ন মহিলাদের সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে অর্থ উপার্জন করে।। কিন্তু আমি কোনভাবেই এই চাকুরী করতে ইচ্ছুক না।। যেখান থেকে জবের অফার আসছিলো, আমি এক প্রকার না করে দিয়ে চলে আসলাম।। এরমধ্যে আমার এক বন্ধু সাইফুল জানালো সে তার বউকে সন্দেহ করে, বিভিন্ন কারণে তার বউয়ের আচরণ তার কাছে সন্দেহজনক মনে হয়।। আমি সাইফুলকে পরামর্শ দিলাম ও যেনো ওর বাসার ড্রইং রুমে একটা গোপন স্পাই ক্যামেরা লাগায়, তাহলে হয়তো অনেক কিছু জানা যাবে।। পরিকল্পনামত তাই করা হলো, সাইফুলের ড্রইং রুমে ক্যামেরা লাগানো হলো, যেটা আমি আর সাইফুল ছাড়া কেউ জানে না।।

আমি যে ব্যাচেলর বাসায় থাকি, সেখানে এক বড় ভাই জাহিদ হন্যে হয়ে চাকুরী খুঁজে বেড়াচ্ছেন, আমার কাছে চাকুরীর ব্যাপারে সাহায্য চাইলেন।। আমি সাতপাঁচ ভেবে তাকে ঐ এজেন্সীতে পাঠালাম, যেখানে তারা ছদ্মবেশে মেইল এস্কর্ট সংগ্রহ করে, তবে জাহিদ ভাইকে আমি আগেই কিছু বলি না, আমি ভাবলাম উনি যাক্‌, দেখি কি হয়।। উনি গুলশানের ওই অফিসে ইন্টারভিউ দিতে গেলেন ঠিকই, কিন্তু প্রায় দু’দি যাবত তার মোবাইল বন্ধ, বাসায় ফিরেন নি, এক প্রকার লাপাত্তা হয়ে গেছেন বলা যায়।। জাহিদ ভাইকে নিয়ে আমার দুঃচিন্তা হচ্ছিলো, এরমধ্যে আমার বন্ধু সাইফুল আমাকে বললো, ওর বাসায় কিছু একটা ঝামেলা হচ্ছে, সে মোবাইলের মাধ্যমে স্পাই ক্যাম মনিটরিং করে জানতে পারলো।। কি সেই ঝামেলা, ঠিক কি চলছে জানতে পড়তে থাকুন-


এই ছিলো প্রথম পর্বের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা, তবে আমি অনুরোধ করবো আরও বিস্তারিত বিশদ আমারে জানতে প্রথম পর্ব পড়ে নিতে পারেন।।


 আরো পড়ুন: রূপোপজীবি | প্রথম পর্ব


এর মধ্যে দিনে দুপুরে সাইফুল আমাকে কল করে উত্তেজিত কণ্ঠে বললো- কই তুই??

আমি একটু ভড়কে গিয়ে বললাম- বাসায়, কেন কি হইছে??

-দোস্ত, আমি তোর বাসার কাছাকাছি, তুই দ্রুত নিচে আয়।।

আমি কোনমতে গায়ে টি শার্ট চাপিয়ে নিচে নামলাম।। বাসার নিচে দাঁড়িয়ে সাইফুলের অপেক্ষা করছি, দেখি সাইফুল মোবাইল রোটেড মুডে ধরে আমার দিকে ছুটে আসছে।। আমিও ওকে দেখে এগিয়ে গেলাম, ও একবার মোবাইলের দিকে তাকাচ্ছে একবার সামনের রাস্তার দিকে।।

সাইফুল আমার কাছে এসেই মোবাইল আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো- দেখ ভাই, আমার বাসার ড্রইং রুমে কি চলছে??

আমি মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে মনে হলো, দুইদফা হার্টবিট মিস করে ফেললাম।। আমাদের তো এখুনি সাইফুলের বাসায় যাওয়া উচিত, কিন্তু…………


আমার মুখে কোন কথা নেই, অবিশ্বাস্য চোখে মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছি।। দেখলাম, সাইফুলের বউ রুনার সাথে সেই তাসনুভা আর একজন অচেনা ছেলে বসে আছে ড্রইং রুমে।। আমি খানিক ভেবে সাইফুলের দিকে তাকিয়ে বললাম- তুই ঠিক কি দেখে আমার কাছে আসলি, কি সমস্যা এখানে?? আসলে আমার ধারণা সাইফুল তো আর তাসনুভাকে চিনে না, তাহলে আমার কাছে এভাবে ছুটে আসার কারণ কি??

সাইফুল জবাব দিলো- আরে ভাই, আমি আধাঘন্টা আগে হবে এমনি অফিসে বসে কানেক্ট করলাম আইপি।। দেখি রুমের মধ্যে এরা বসে আছে।। আমি একটু অবাক হলাম, উনারা আবার কারা, আমি স্বাভাবিক ভাবেই দেখে যাচ্ছিলাম, কিন্তু দোস্ত একটু পরে দেখি ওই বেটি আমার বউকে মনে হলো বকাবকি করছে, নিজের মোবাইলে কিসব দেখিয়ে কি যেনো বলছে।। তুই দেখ এখন তো তিনজনেই বসে আলাপ করছে, অথচ একটু আগে দেখলাম এই বেটির এমন ভাব, পারলে আমার বউকে মার দিবে।। আর আমার বাসায় এরা কারা, আমি রুনাকে কল দিলাম, ও তো ফোন ধরছে না।। আমি তাই বুঝে না বুঝে অফিস থেকে দৌড়ে তোর কাছে আসলাম, কি করবো এখন বল??

সাইফুল এক করুণ দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, ঘর্মাক্ত ক্লান্ত এক চেহারা।। আমি দিলাম অন্য ভাবনায় ডুব, আমি তো এই মহিলাকে চিনি।। অন্তত মোবাইলে দেখে আমি মোটামুটি নিশ্চিত এই মহিলা ওই মেইল এস্কর্ট অফিসে দেখা তাসনুভাই হবে, পাশে বসা ছেলেটা কে, আগে কোনদিন দেখি নাই মনে হচ্ছে।। আমি ভাবনা থেকে বের হতে পারছি না, এত সব হিসাব মেলানো কি সহজ।।

সাইফুল আমাকে তাগাদা দিয়ে বললো- ওই চল আমার সাথে, বাসায় যাবো, এখুনি যাবো।।

আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না।। আমরা এখন আগারগাঁও ষাট ফিটে আছি, সাইফুলের বাসা সেই খিলগাঁও সিপাহীবাগ।। আমরা যেতে যেতে তারা কি থাকবে, বা হুট করে বাসায় গিয়ে কি হবে।। তবুও বন্ধুর বিপদে আমার অবশ্যই পাশে থাকা উচিত, আর সবচেয়ে বড় কথা সাইফুল না চিনলেও আমি এই মহিলাকে চিনি।। এখন এই মহিলার পরিচয় সাইফুলকে দেয়া বোকামী হবে, বরং সিপাহীবাগের দিকে ছুটি।।

সিএনজি নিয়ে সাইফুলের বাসার দিকে যাচ্ছি।। দুপুর ২ টার মত বাজে, পেটে ক্ষুধা অনুভব করার কথা, কিন্তু চিন্তায় কিছুই ভালো লাগছে না।। এরমধ্যে আমরা সিএনজিতে বসে ড্রইং রুমের দৃশ্য দেখেই যাচ্ছি।। সাইফুলের বউয়ের মুখের ভঙ্গিমা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, কিছু একটা নিয়ে দেন-দরবার চলছে মনে হচ্ছে।। আমি ভাবছি আচ্ছা, সাইফুল তো কানেক্ট করার পর দেখলো এই দৃশ্য।। এর আগে তবে কি রেখে কি হয়েছে কে জানে, অনেকগুলো বাজে ধারণা একসাথে মাথায় চেপে বসলো, ভাবতে গেলে দম বন্ধ হয়ে যায়।। আমাদের সিএনজি যখন কাওরানবাজারের বিশাল সিগনালে তখন দেখলাম, সাইফুলের বউ ভিতরের রুমের দিকে গেলো।। ওই মহিলা আর ছেলেটা বসে নিজেদের মধ্যে কি যেনো আলাপ করছে।। 

খানিকবাদে সাইফুলের ফোন বেজে উঠলো, ওর বউ কল করেছে।। আমি সাইফুলকে শুধু বললাম- একদম স্বাভাবিক গলায় কথা বল।। ধর ফোন-

হ্যালো, হ্যাঁ বলো।। কতগুলো কল দিলাম কই ছিলা??

আমি সাইফুলের কানের কাছে কান নিয়ে গেছি, বাইরের রাস্তার গাড়ি-ঘোড়ার শব্দে তেমন কিছু শোনা যাচ্ছিলো না।। অগত্যা সাইফুলের আলাপ শেষ করার অপেক্ষায় রইলাম।।

ফোন রেখে সাইফুল, আবার আইপি কানেক্ট করতে করতে বললো- দোস্ত, রুনা তো বাইরে যাচ্ছে।।
আমি জিজ্ঞেস করলাম- মানে কি, বাইরে কই যায়??

সাইফুল জবাব দিলো- রুনা আমাকে বলে ও ফোন রেখে কিচেনে ছিলো, তাই ফোন ধরতে পারে নাই।। ডাহা মিথ্যা কথা, এখন বললো ও একটু বের হচ্ছে, ওর খালা নাকি অসুস্থ সেখানে যাবে, সন্ধ্যার দিকে চলে আসবে।।

আমি বললাম- শালা, তোর বউয়ের খালা আবার কই থাকে??

-আছে ওর এক খালা, মগবাজার থাকে।। বললো ওখানে যাবে, কিন্তু আমি জানি এইটা মিথ্যা কথা, এদের সাথে বের হবে কিনা কে জানে??


মোবাইলে আবার আইপি কানেক্ট হতেই ড্রইং রুমের দৃশ্য ভেসে এলো।। আগের দৃশ্যই চলছে, তাসনুভা আর ছেলেটা বসে আছে, এবার একটু চুপচাপ যার যার মোবাইল ঘাঁটছে।। খানিক বাদে রুনা মনে হলো পোশাক পরিবর্তন করে এসেছে, দাঁড়িয়ে আছে, তাসনুভা আর ছেলেটা দাঁড়িয়ে গেলো।। তাসনুভা রুমের ফ্যানের সুইচ বন্ধ করে, রুম থেকে ওদের নিয়ে বেরিয়ে গেলো।।

আমি হতভম্ব হয়ে সাইফুলের দিকে তাকিয়ে রইলাম, সাইফুলের চেহারা এমনিতে বোকা বোকা টাইপ।। এখন ওকে গাধার মত লাগছে, একদম নিরীহ, বার বার করুণ দৃষ্টিতে আমাকে বিদ্ধ করছে।। ওর চোখের ভাষা পড়তে চাইলে এটাই দাঁড়ায়, কি হচ্ছে এসব, কি হচ্ছে।।

জ্যাম ট্যাম ঠেলে, আমরা সাইফুলের বাসায় ঢুকলাম।। দরজা খুলে ঢুকতেই আমি একটু ধাক্কা খেলাম, পুরো ড্রইং রুমে সেই পারফিউমের গন্ধ এখনো ম ম করছে, এই গন্ধটা আমার চেনা।। কি কড়া পারফিউম রে বাবা, না জানি কত দাম দিয়ে বেটি কিনছে, কখন রুম থেকে চলে গেছে এখনো গন্ধ আছে।। আবার এমন হতে পারে, মহিলারা তো পার্সে করে মেকাপের জিনিসপত্র নিয়ে ঘুরে।। রুমে এসে হয়তো গায়ে মেখেছে দুই একবার।।

সাইফুল আর আমি ওর বাসার বেডরুমে গেলাম।। সাইফুল খুব সন্দেহ নিয়ে চারপাশে তাকাচ্ছে, আমি তো এই বাসায় একবার এসেছিলাম, সাইফুলের বিয়ের পর পর তাই কোন পার্থক্য আমার পক্ষে ধরা সম্ভব না।। আমি সাইফুলকে বললাম- দোস্ত, কোন সমস্যা?? সিরিয়াস কিছু??

সাইফুল রুমের চারপাশে তাকিয়ে বললো- না দোস্ত, সব তো ঠিকই আছে।। বা*ল আমি যদি ক্যামেরাটা আরেকটু আগে চালু করতাম, তাইলে বুঝতাম কি হইলো।। আচ্ছা, দোস্ত তোর ভাবী কই গেলো?? কি করি বল তো, এই মানসিক যন্ত্রণা আর নিতে পারছি না।। বলে সাইফুল ওর বিছানায় ধপ করে বসে পড়লো।।

আমি ভাবলাম, এখন কি সাইফুলকে ওই তানসুভা মহিলা আসলে কি করে, আমি যে তাকে চিনি এসব কথা বলবো কিনা।। আমি সাইফুলের দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, বলা উচিত, এখুনি সব খুলে বলা উচিত।।

-দোস্ত, তোর বাসায় যে মহিলা আসছিলো, তাকে আমি চিনি জানিস??

সাইফুল একদম সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে মুখটা বাঁকা করে বললো- কাকে চিনিস? বুঝি নাই!!

-যে মহিলা তোর বাসায় আসছিলো একটু আগে, যার সাথে তোর বউ বের হয়ে গেলো।।

সাইফুল পরিষ্কার গলায় বলে যাচ্ছে- তুই চিনিস, কিভাবে।। আর আগে তো বললি না, আরে ভাই বল কিভাবে চিনিস, বল??

উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছে সাইফুল , আমি বিছানায় ওর পাশে বসলাম।। তারপর ওই এড এজেন্সীতে যাওয়া থেকে শুরু করে সব ঘটনা একে একে খুলে বললাম।। এমনকি সাইফুল জাহিদ ভাইকে হালকা পাতলা চিনতো, এক দুইবার দেখা করিয়ে দিয়েছি, সেই জাহিদ ভাইকে ওখানে কিভাবে পাঠিয়েছিলাম, তারপর উনি যে দুইদিন ধরে নিখোঁজ, সেই ব্যাপারটাও বললাম।।

সাইফুল দুই হাতে মাথা চেপে ধরে বসে আছে, আমার দিকে অগ্নি চোখে তাকিয়ে বললো- ওই দোস্ত, তাইলে আমার বউ কি ন**ট  মা**গ নাকি?? দোস্ত, আমার তো লাইফ শেষ, কি করমু আমি!!

আমি সাইফুলকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম- আরে থাম বেটা, তোর বউ আর ওই মহিলার কিসের কানেকশন আছে কে জানে, আগেই সবটা না জেনে লাফালাফি শুরু করেছিস।। ধৈর্য্য ধর, এই সমস্যার সমাধান হবেই, দেখ না কোথাকার জল কোথায় গড়ায়।। প্রয়োজনে আমি আবার ঐ অফিসে যাবো, পুলিশ নিয়ে যাবো।।

সাইফুল কিছুতেই শান্ত হতে পারছে না, সে ফোন বের করে রুনাকে কল দিলো।। রুনা রিসিভ করছে না, সাইফুল বললো- মগবাজার যাবো নাকি, ওর খালার বাসায়??

আমি সাইফুলকে বাঁধা দিয়ে বললাম- তোর বউ চলে আসবে, আপাতত একদম না জানার ভান করে থাক, দেখি কি বের হয়।। আর আমি আজ যাই, চিন্তা নিস না, এবার খালি চুপ করে বসে থাক, লাগলে আমার সাথে চল বাইরে বের হই।। অফিস টাইম শেষে স্বাভাবিক ভাবে আবার বাসায় ঢুকিস।।

সাইফুলের আমার প্রস্তাব মনঃপুত হলো, আসলে বেচারা রাজ্যের চিন্তা নিয়ে এখন বাসায় থাকতে পারতো না।।

আরো পড়ুন: রূপোপজীবি | প্রথম পর্ব

আজ তৃতীয় দিন, জাহিদ ভাইয়ের কোন খোঁজ নেই।। তমাল এসে বার বার জিজ্ঞেস করে, ভাই গেলো কই।। আমি ভাবলাম, বাড়িতে চলে গেলো না তো হুট করে, জাহিদ ভাইয়ের বাড়ি যশোর।।এদিকে সাইফুল বউয়ের সাথে কিছুই না জানার ভান করে আছে।। আমি সাইফুলকে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি, আমি দেখেছি যখন মানুষ এমন কোন পরিস্থিতিতে পড়ে, আপাতদৃষ্টিতে তার স্বাভাবিক জ্ঞান লোপ পায়।। তখন অন্যের পরামর্শগুলোতে তারা বড় করে দেখে, আমার বন্ধুর হইছে সেই দশা।।

আমি একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি না, মেইল এস্কর্টের সাথে সাইফুলের বউয়ের কি সম্পর্ক।। একটা ইয়াং মেয়ে, বিয়ে হয়েছে তিন মাসের মত, তার স্বামী বর্তমান আছে, এই মেয়ের মেইল এস্কর্ট এর দরকার হওয়া অস্বাভাবিক।। আর মেইল এস্কর্ট লাগলেও, এভাবে কেউ বাসায় আসবে না, আর এস্কর্টের সদস্যের সাথে নিশ্চয় তাসনুভা নিজে ঘোরাঘুরি করবে না।। সাধারণত মেইল এস্কর্টে যুক্ত হয় যারা, তারা একটু উঁচু শ্রেণীর মহিলা বা মেয়ে হয়ে থাকেন, দেখা গেলো স্বামী নেই কিংবা ডিভোর্স হয়ে গেছে, বা অন্য কোন সমস্যা আছে তাদের একটা অংশ এখানে যাতায়াত করেন।। তাহলে সাইফুলের বউয়ের সাথে এই এস্কর্টের সদস্যদের কি সম্পর্ক!!

এদিকে আমি আর তমাল জাহিদ ভাইয়ের বিছানা, টেবিল ঘাঁটাঘাটি করছি।। কোনভাবে যদি তার বাবা মা বা পরিবারের কোন সদস্যের নাম্বার পাওয়া যায়।। কিন্তু ভালো করে খুঁজেও এমন কিছু পেলাম না, আশ্চর্য ব্যাপার এই লোকটা কি বেমালুম গায়েব হয়ে গেলো।। আচ্ছা, ওখানে জব হলে কি এমন কোন সিস্টেম আছে যে, ওখানে আমাকে থাকতে হবে, মোবাইল টোবাইল সব অফ করে।। এখন তাসনুভার নাম্বার না আনার কারণে আমার আফসোস হচ্ছে, উনার নাম্বার থাকলে আমি নিশ্চয় যোগাযোগ করে জানতে পারতাম।। মনে মনে একটা প্রস্তুতি নিলাম, আমি সাইফুলকে নিয়ে গুলশানের ঐ অফিসে যাবো।।

সাইফুলকে কল করে প্রস্তাব দিলাম, সাইফুল প্রথমে গড়িমসি করলেও পরে ওখানে যাবার গুরুত্ব বুঝতে পেরে রাজী হয়ে গেলো।।

……………

গুলশান এক থেকে দুই এর দিকে যেতে, ঠিক মাঝামাঝি অফিসটা।। আমি আর সাইফুল লিফটে করে ভবনের ১৩ তলায় উঠলাম, সাইফুলকে খুব নার্ভাস দেখাচ্ছে কিন্তু আমি স্বাভাবিক আছি।। হাজার হোক, আগে একবার এসেছি অন্তত আমাকে তো ভড়কে গেলে চলবে না।। ভিতরে গেলাম, সিকিউরিটি গার্ডকে বললাম, আরাফাত সাহেব আছেন??

একসাথে দুজনকে দেখে সিকিউরিটি গার্ড কেমন কুতকুত করে তাকাচ্ছেন মনে হলো।। সে জিজ্ঞেস করলো- আপনাদের কি ইন্টারভিউ আছে??

আমি জবাব দিলাম- না উনার সাথে দেখা করা দরকার।।

গার্ড বললো- আপনারা বসেন, ভিতরে ইন্টারভিউ চলে।।

আমি আর সাইফুল আড়ষ্ট হয়ে রিসিপশনের সোফায় বসে রইলাম।। সাইফুল খুব এদিক ওদিক তাকাচ্ছে, ছেলেটা যে সত্যি মহা চিন্তায় আচ্ছন্ন তা ওর চেহারা দেখে যে কেউ বলে দিতে পারবে।। আমি সাইফুলের হাঁটুতে হাত রেখে বললাম- ব্যাপার না, স্বাভাবিক থাক কিচ্ছু হবে না, বুঝলি!!

খানিকবাদে একটা ভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হলো।। দেখলাম ইন্টারভিউ রুম থেকে শাফাত সাহেব আর একটা ছেলে বের হলেন, আমি নিশ্চিত এবার ঐ পাশের দরজা দিয়ে এরা তাসনুভার কাছে যাবেন।। শাফাত সাহেব আমাদের দু’জনকে দেখে তেমন অবাক হলেন না, মনে হয় এক দেখায় চিনতে পারেন নাই।। না চেনাই স্বাভাবিক, প্রতিদিন এমন কত জনকে ঘোল খাওয়ায় কে জানে।। উনারা জাস্ট রিসিপশন পেরিয়ে অন্য দরজা ধরে চলে গেলেন।। শাফাত সাহেবের সাথে ছেলেটার চেহারা দেখেই বুঝলাম, বেচারা বিরাট গোলক ধাঁধায় আছে, আজ থেকে দিন দশেক আগে আমি যে ধাঁধায় ঘুরপাক খাচ্ছিলাম আর কি।।

গার্ড নিজেই গিয়ে ইন্টারভিউ রুমে উঁকি মারলো, কিসব বলে আমাদের দুজনকে বললো- স্যার ঐ রুমে আছেন, আপনারা যেতে পারেন।।

আমি উঠে দাঁড়ালাম, সাইফুল আস্তে আস্তে উঠলো।। তারপর আমরা ইন্টারভিউ রুমে গেলাম।। যেখানে আরাফাত সাহেব বেশ কৌতুহল নিয়ে বসে আছেন মনে হলো।।

আমি অভ্যাসবশত সালাম দিলাম, সাথে সাইফুলও।। সালাম দিয়েই মনে মনে ভাবলাম, এইসব মেইল এস্কর্টের লোকদের আবার সালাম দিচ্ছি, কী  হাস্যকর।।

আমি আর সাইফুল উনার মুখোমুখি চেয়ারে বসলাম।। উনি খুব মনযোগ দিয়ে আমাকে পর্যবেক্ষণ করে বললো- আপনি কি এর আগে এখানে এসেছিলেন??

আমি একটু দ্বিধান্বিত, উনাকে কি স্যার বলবো, নাকি বলবো না।। পরে ভেবে বললাম- জ্বী ভাই আসছিলাম।।

ভাই বলাতে আরাফাত সাহেব একটু মনঃক্ষুণ্ণ হলেন মনে হচ্ছে, আমি মনে মনে ভাবলাম বেটা করিস পুরুষ মানুষের দালালী আবার তোরে বলুম স্যার, তাই না, ভাই না বলে নাম ধরে ডাকলে মজা পাইতাম।।

আরাফাত সাহেব বললেন- আপনি কি এখন কাজ করতে ইচ্ছুক, আর ইনি কে সাথে।। সাইফুলের দিকে নির্দেশ করে বললো।।

আমি বললাম- এ আমার বন্ধু, সাইফুল।। আমি আসলে ভাই একটা লোকের ব্যাপারে জানতে এসেছিলাম।।

আরাফাত সাহেব ভ্রু কুঁচকে বললেন- লোকের ব্যাপারে, কোন লোক??

-মানে ভাই, ক’দিন আগে মানে এই তিন-চারদিন আগে আমার বাসার একজনকে এখানে পাঠাই, কিন্তু উনি আর ফেরেন নি।। মোবাইল টোবাইল সব বন্ধ, আমি মূলত উনার খোঁজে এখানে এসেছি।।

আরাফাত লোকটা খুব অস্বাভাবিক ভাবে আমার দিকে তাকালেন- দেখেন আমাদের এখানে প্রতিদিন অনেকেই আসে, আপনি জানেন।। আর এখানে কি রিকোয়ারমেন্ট হয় আপনি এসেছেন, আপনার জানার কথা।। এখানে জব হলেও আমরা কাউকে আটকাই না, এখানে জব হলে আপনি চলে যাবেন, আপনার ডাক পড়লে আমরা আপনাকে ডেকে দিবো ব্যস।। আপনি নাম বলুন তো দেখি, ডাটা খুঁজে দেখি।।

আমি নিজে জাহিদ ভাইয়ের সিভি থেকে এপ্লাই করেছিলাম, কিন্তু এখন উনার পুরো নাম মনে পড়ছে না, কী বিব্রতকর ব্যাপার।। আমি আমতা আমতা করে বললাম- জাহিদ, বাড়ি যশোর, পুরো নাম জাহিদুর রহমান জাহিদ সম্ভবত, আসছিলো তিনদিন আগে, আর হ্যাঁ ইন্টারভিউ টাইম রাত আটটায় ছিলো।।

আরাফাত সাহেব উনার পাশে চাপিয়ে রাখা ল্যাপটপ ওপেন করলেন।। এরমধ্যে সাইফুল একটা কথাও বলে নি, সে চুপচাপ সব শুনে যাচ্ছিলো।। আসলে আর কেউ না জানুক আমি তো জানি, ওর চিন্তা হলো ওর বউয়ের সাথে এই এজেন্সির মহিলার কি সম্পর্ক এটা জানা।। কিন্তু এটা তো এভাবে এখান থেকে জানা যাবে না, এর জন্যে অপেক্ষা করতে হবে, কৌশল করে জানতে হবে।।

আরাফাত সাহেব, কিছুক্ষণ ল্যাপটপের স্ক্রিন নিজের দিকে নিয়ে কি সব ঘাঁটাঘাঁটি করে বললেন- নাম কি জাহিদুর রহমান জাহিদ, নাকি আরমানুল ইসলাম জাহিদ।।

আমি উনার কথা শেষ হতে না হতেই, মাথা নাড়িয়ে বললাম- আরে হ্যাঁ হ্যাঁ, আরমানুল জাহিদ, আমি আসলে পুরো নাম ভুলে গেছিলাম।। পাইছেন আপনি??

-হুম পেলাম তো।। কিন্তু উনি তো জব করতে রাজী হন নাই।। পরে চলে গেছেন, সম্ভবত।। আচ্ছা ওয়েট আমি আরেকটু সিওর হই।।

বলে আরাফাত সাহেব আবার ল্যাপটপে মনোযোগ  দিলেন।। এরমধ্যে দরজা ঠেলে শাফাত এসে প্রবেশ করলো।। উনাকে ঢুকতে দেখে আমরা ঘুরে তাকালাম, উনি এবার আমাদের দু’জনকে এখানে দেখে একটু বিস্মিত হলেন মনে হচ্ছে।। শাফাত ঢুকার সাথে সাথে আরাফাত সাহেব বললেন- আরে শাফাত এইদিকে আসো তো, একটা ব্যাপার একটু সিওর করো তো।। এবার আমাকে দেখিয়ে বললেন- উনি এর আগে এখানে ইন্টারভিউ দিতে আসছিলেন, এখন একজনের ব্যাপারে খোঁজ নিতে আসছেন।।

শাফাত আমাদের দিকে ঘুরে ঘুরে তাকিয়ে, টেবিলের ভিতরের দিকে আরাফাত সাহেবের পাশের চেয়ারে বসলেন।। আরাফাত সাহেব ল্যাপটপ একটু ঘুরিয়ে শাফাত সাহেবকে দেখিয়ে বলছেন- এই ছেলেটা যে আসছিলো, সে পরে ক্যান্সেল করে দেয়, এখান থেকে তো চলে যায় তাই না।।

শাফাত ল্যাপটপ থেকে মুখ সরিয়ে আমাদের দিকে তাকালেন, চেহারায় অনেকটা বিরক্তি  নিয়ে, তারপর আরাফাত সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন- হুম, এই লোক এসে একটু হাঙ্গামাও করে, পরে চলে যায়।।

আমি অস্ফুট কণ্ঠে বললাম- কিন্তু ভাই, জাহিদ ভাই তো বাসায় যান নাই, সে তো আজ তিনদিন ধরে গায়েব।। আপনারা কি সিওর সে এখান থেকে চলে যায়।।

শাফাত একটু চড়া গলায় বললো- আরে ভাই এই লোক আসছিলো, আমরাই ইন্টারভিউ করছি, তারপর যা হবার হইছে সে চলে যায়।। আসলে আমরাই তাকে রিজেক্ট করে দেই, কারণ আমাদের আর একটু অল্প বয়স আর একটু গুড লুকিং দরকার।। 

আমি কোন কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম না, কি করবো, কি বলবো, কে জানে।। আমি এবার উনাদের দিকে তাকিয়ে বললাম- তাসনুভা ম্যাম কি আছেন, উনার সাথে আমি একটু কথা বলতাম।। আর জাহিদ ভাই মনে হয় তাহলে বাড়ি চলে গেছেন।।


আরাফাত শাফাত একে অন্যের দিকে তাকালেন, তারপর শাফাত বললেন- তাসনুভা ম্যাম একটু বিজি, আপনারা রিসিপশনে বসেন, উনি ফ্রি হলে আপনাকে জানাবো।।

আমি আর সাইফুল ইন্টারভিউ রুম থেকে বেরিয়ে রিসিপশনে এসে দেখি, এক গোবেচারা বসে আছে।। আমি নিশ্চিত সে ইন্টারভিউ দিতে আসছে, আমরা বের হওয়ার সাথে সাথে ছেলেটা আমাকে দেখে দাঁড়িয়ে বললো- ভাই, কি জিজ্ঞেস করে??

আমি সাইফুলের দিকে মুচকি হেসে, আবার ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বললাম- জিজ্ঞেস করে, সাইজ কত, বুঝলেন।। 

বেচারা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে, আমার কথার আগামাথা বুঝবে না এটাই স্বাভাবিক, তারপর বললো- ভাই এখানে আসলে কাজ কি, আমি ওভাবে ক্লিয়ার না।।

আমি বললাম- ভাই একটু পরে ইন্টারভিউ দিতে ডাকবে যান, তবে ভাই আপনাকে দিয়ে চাকরী হবে না।। আপনি দেখতে সুন্দর না।।

ছেলেটা এবার একটু টানটান করে দাঁড়ালো, আর বললো- ভাই ঠিক আছে দেখি আমার জব হয় কি হয় না।।

এরমধ্যে গার্ড ছেলেটাকে ভিতরে যাবার নির্দেশ করলো। আমি সাইফুলের দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হেসে দিলাম।। 

সাইফুল আর আমি আবার সোফায় বসে আছি।। সাইফুল মোবাইল বের করে ডাটা কানেক্ট করে, আইপি দিয়ে বাসার অবস্থা চেক দিচ্ছে।। ড্রইং রুমে কেউ নেই, আমিও মাঝে মাঝে ওর মোবাইলের দিকে তাকাচ্ছি।। আমি আর সাইফুল আলাপ করে যাচ্ছি, সাইফুলকে অযথাই চিন্তিত মনে হচ্ছে।। সে মোবাইল সোজা করে মনে হলো বউকে কল দিলো।। টানা তিনটা কল দিলো, বউ রিসিভ করলো না।।

কল দিতে দিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললো- রুনা তো মনে হয় বাসায় নাই রে, আবার কোথাও গেছে।।

আমি বললাম- শোন, এই খেলা শেষ দে।। আজ বাসায় গিয়ে সরাসরি ধরবি, প্রয়োজনে ডিভোর্স দিয়ে দে, এই রকম মেয়ের সাথে প্রেম করাই দায়, আর তো ভাই ঘরের বউ।। বাদ দে ভাই।।

সাইফুল মাথা নাড়াতে নাড়াতে পরপর তিনটা কল দিয়ে ক্ষান্ত হলো।। আবার আইপি কানেক্ট করে, দেখছে আগের দৃশ্যই।। আমি আবার বললাম- ঘুমাচ্ছে টুমাচ্ছে না তো, রুমের মধ্যেও ব্যাটা ক্যাম লাগালে ভালো হতো, অন্তত তোর বেড রুমে।।

সাইফুল মৃদু হেসে বললো- হ রুমের মধ্যে না, রুনের গায়েই লাগিয়ে দেয়া উচিত।। যাই হোক, তোর জাহিদ ভাই গেলো কই বল তো।।

আমি আবার চিন্তায় পড়লাম, আসলেই তো লোকটা বেমালুম গায়েব হয়ে গেলো।। এখান থেকে কি আমাকে সঠিক তথ্য দিচ্ছে, নাকি ওরা অন্য কোন চক্র, আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না, মাথা কাজ করছে না।। জাহিদ ভাই যদি বাড়িতে গিয়েও থাকেন, এভাবে ফোন টোন সব অফ থাকবে কেন।।

এসব ভাবনার মধ্যে চরমভাবে ছেদ পড়লো, সামনের দৃশ্য দেখে।। ওপাশের দরজা ঠেলে দু’জন মানুষ এসে রিসিপশন দিয়ে বেরিয়ে যাচ্চিল, একজন তাসনুভা আর একজন সাইফুলের বউ।।

আমি উনাদের দেখে সোজা দাঁড়িয়ে পড়লাম।। মুখে কোন কথা নেই, সাইফুল কেমন যেনো প্রত্যাশিত চাহনি নিয়ে ওদিকে তাকিয়ে আছে, কে জানে ও আগেই আঁচ করতে পারছিলো কিনা।।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেলো, সাইফুলের বউ!! মেয়েটা আমাদের দেখে এমন ভাবে দাঁড়িয়ে পড়লো, সেই চেহারার বর্ণনা কোন ভাষায় লিখে বোঝানো সম্ভব না।। কিংবা আমার মনে হয় কাউকে দিয়ে অভিনয় করালেও এই চেহারা পুরোপুরি ফুটিয়ে তোলা যাবে না।। তাসনুভাও হয়তো অবাক, আবার আমাকে এখানে দেখে, সে কি জানে এই সাইফুল এই মেয়ের জামাই!!

আমরা কেউ কোন কথা বলছি না, এভাবে কতক্ষণ কেটে যাবে কে জানে………

ঠিক সেই মুহূর্তে, আমার ফোন বেজে উঠলো, কিছুটা মোহ ভঙ্গ করে ফোনটা ধরলাম, অপরিচিত নাম্বার থেকে কল।। ওপাশ থেকে একটা আর্তনাদের কণ্ঠ, হয়তো জাহিদ ভাইয়ের কণ্ঠ- ভাই, আমাকে বাঁচাও ভাই, আমাকে বাঁচাও!! আমি মরে যাবো ভাই, আমাকে বাঁচাও!!

আরো পড়ুন: রূপোপজীবি | প্রথম পর্ব
পরের পর্বে সমাপ্ত হবে।