কলা ছিলে দিলে কেন, বুজায়ে দাও

সম্প্রতি কক্সবাজারের ও টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবিরে কর্মরত কয়েকটি এনজিও কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসনের নজড়দারি বাড়ায় সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে গুটিকয়েক। আর এতেই দেশী বিদেশী গণমাধ্যমগুলো উঠেপরে লেগেছে সরকারের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডায়। আসুন বিদেশী গণমাধ্যমে কি ধরনের খবর প্রকাশিত হয়েছে তার কিছু নমুনা সম্পর্কে অবগত হই।  

ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল লিখেছে, মোবাইলসেবা বন্ধের ব্যাখ্যায় সরকার বলেছে, এই পদক্ষেপ অপরাধী চক্রগুলোর তৎপরতা কমাবে। কিন্তু একই বাক্যে সংবাদদাতা জন ইমন্ট লিখেছেন, অধিকারকর্মীরা বলছেন যে বিপদাপন্ন জনগোষ্ঠী আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমার থেকে আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে যোগাযোগ এবং খবর রাখার জন্য উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠী মোবাইলসেবার ওপর নির্ভরশীল ছিল এবং এই সিদ্ধান্ত তার ওপর একটি বড় আঘাত। কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে থাকা রোহিঙ্গারা এতে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে (বাংলাদেশ কাটস মোবাইল অ্যাকসেস টু রোহিঙ্গা রিফিউজিস, ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯)।

নিউইয়র্ক টাইমস একই ধরনের ভাষ্যের পাশাপাশি লিখেছে, মিয়ানমারের নেতৃত্ব যেখানে এখনো সহিংসতার দায় স্বীকার এবং ভবিষ্যতে আর কোনো সহিংসতা হবে না—এমন অঙ্গীকার করেনি, সেখানে বাংলাদেশ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে চাইছে। পত্রিকাটির সংবাদদাতা হানা বিচ লিখেছেন, বাংলাদেশ মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিলেও উদ্বাস্তু হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, কেননা ওই স্বীকৃতির সঙ্গে অনেকগুলো অধিকার দেওয়ার প্রশ্ন আসে (আ মিলিয়ন রিফিউজিস মে সুন লুজ দেয়ার লাইন টু আউটসাইড ওয়ার্ল্ড, ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯)। রাতের বেলা এবং ভোরে শিবিরগুলোয় মোবাইল সংযোগ থাকে না উল্লেখ করে পত্রিকাটি লিখেছে, রাতের বেলায় সেখানে কারফিউ থাকায় বিপদ ঘটলেও সাহায্যকর্মীরা সেখানে যেতে পারেন না। অন্যান্য জায়গার মতোই এত বড় একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সময়ে সময়ে সহিংসতা এবং নানা ধরনের অপরাধ ঘটতেই পারে। মাদক কারবারসহ অপরাধ দমনকে মোবাইল নিষিদ্ধের কারণ হিসেবে সরকারিভাবে বলা হলেও রোহিঙ্গারা বলছে, নিরপরাধ লোকজনকেও অহেতুক শায়েস্তা করা হচ্ছে। বাংলাদেশে উদ্বাস্তু শিবিরের মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা প্রসঙ্গে পত্রিকাটি শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া, সুদান ও ভারতের কথা উল্লেখ করে বলেছে, ওই সব দেশে সংঘাতকে আড়াল করার জন্যই ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। বাংলাদেশে কোনো সংঘাত নেই এবং তা আড়াল করার প্রশ্নও নেই। কিন্তু এ রকম একটা তুলনা চলে এসেছে।

গার্ডিয়ান লিখেছে, জল্পনা রয়েছে যে সামরিক অভিযানের মুখে মিয়ানমার থেকে নির্বাসিত হওয়ার দুই বছর পূর্তিতে গত ২৫ আগস্ট অহিংস সমাবেশ আয়োজনের কারণেই যোগাযোগ ব্যবস্থায় এই কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। ওই সমাবেশের অনুমতি প্রদানকারী কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে অপসারণের কথা জানিয়ে সংবাদদাতা ক্যারেন ম্যাকভে লিখেছেন, রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে ব্যর্থ হওয়ার কারণে বাংলাদেশ সরকারের হতাশা বাড়ছে (বাংলাদেশ ইমপোজেস মোবাইল ফোন ব্ল্যাকআউট ইন রোহিঙ্গা রিফিউজি ক্যাম্পস, ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯)। এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা কঠিন হবে বলে জাতিসংঘের একটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে পত্রিকাটি লিখেছে, মোবাইল সিমের একটা কালোবাজার রয়েছে এবং সেখানে অল্প টাকাতেই তা পাওয়া যায়। দ্বিতীয়ত, অনেকের কাছে মিয়ানমারের সিম আছে, যেগুলো পাহাড়ের ওপরে উঠলে সচল হয়। স্থানীয় যুবলীগ নেতা ওমর ফারুক হত্যাকাণ্ডের জেরে গত সপ্তাহান্তে চতুর্থ আরেকজন রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু গুলিতে নিহত হওয়ার কথা তাদের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ইকোনমিস্ট সাময়িকীও অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথিদের নিয়ে বাংলাদেশের হতাশার কথা লিখে বলেছে, তাদের আরও বিচ্ছিন্ন করায় কোনো সমাধান নেই (নো সিগন্যাল: বাংলাদেশ ব্যানস মোবাইল ফোনস ফর ওয়ান মিলিয়ন রোহিঙ্গা রিফিউজিস)। ধারণক্ষমতার অতিরিক্তসংখ্যক উদ্বাস্তু তাদের নির্ধারিত শিবির এলাকার বাইরে যেতে পারে না বলে বাকি বিশ্বের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে মোবাইল ফোন। ইকোনমিস্ট জাতিসংঘের একজন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করেছে, যিনি বলেছেন, এর মাধ্যমে নির্যাতিত একটি জনগোষ্ঠীকে আরও বিচ্ছিন্ন এবং দুর্ভোগের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। তাঁর আশঙ্কা, এর মাধ্যমে তাদের নেতিবাচক কাজের দিকে ঠেলে দেওয়া হবে, তা সে অপরাধ হোক কিংবা জঙ্গিবাদ।

রোহিঙ্গা শিবিরগুলোয় মোবাইল ফোনসেবা বন্ধের নির্দেশই এসব শিরোনামের প্রধান কারণ হিসেবে খবরগুলোতে দেখানো হলেও বিশ্লেষকরা বলছেন অন্য কথা। তাদের ধারনা সরকার এনজিও গুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ায় দেশী বিদেশী কিছু পক্ষের স্বার্থে দারুণভাবে আঘাত লেগেছে আর এতেই আন্তর্জাতিকভাবে একাট্টা এসব প্রোপাগান্ডা।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশকে ভাসানচরে স্থানান্তরে সরকারকে সমর্থন না দিলে জাতিসংঘকে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যেতে বলা হবে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি জার্মান রেডিও ডয়চে ভেলেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই হুঁশিয়ারি দেন। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে অপরাধ বেড়ে যাওয়া, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত রোহিঙ্গাবিরোধী কিছু সমাবেশ এবং মাদকের কারবার ও মানব পাচারের মতো অপরাধে রোহিঙ্গাদের জড়িত থাকা, এনজিওগুলো রোহিঙ্গাদের জন্য দেশীয় অস্ত্র মজুত ও সরবরাহে উদ্বেগের কোন লক্ষণ কোন গণমাধ্যমেই প্রকাশ পায়নি।

প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের জাতিগত নির্মূলনীতির কারণে পরিচালিত গণহত্যা থেকে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসা প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে। এই মাহাত্ম্যের কারণেই মানবিক জাতি হিসেবে গত দুই বছর বাংলাদেশ বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু গত কয়েক দিনের কিছু পদক্ষেপের কারণে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রগুলোয় বাংলাদেশ ও রোহিঙ্গাদের প্রসঙ্গটি আবারও ফিরে এসেছে। তবে তা মোটেও সুখকর নয় বরং অনেকটা চোখ রাঙানির মতন।

ইয়াকুব আলী মিঠু: সাংবাদিক

আরো পড়ুন: ডেঙ্গু তবে কোথায় জন্মায়?

আরো পড়ুন: দুর্গাপূজায় শাকিবের মুখোমুখি অপু বিশ্বাস