মুনার অচেনা শহর | প্রথম পর্ব

আমি মায়মুনা, বাড়িতে সবাই মুনা বলেই ডাকে। আমরা পাঁচ বোন। আমারছোট বোন আমার থেকে পনের বছরের ছোট। আমার মা বাবা ছেলের আশায় এই শেষ বয়সে আমাদের চার বোনকে লজ্জায় ফেললো। শুধু বড় বোন মিনু সবাইকে ধমক স্বরে বললো, ” তোদের কি খেয়ে দেয়ে কাজ নেই, ছোট বোনকে আদর করতে না পারিস এমন কথা বলিস না, যেটা সে বড় হয়ে শুনে কষ্ট পাবে। ” বড় বুবুর সে সবকিছুতে ভালো খোঁজার মহৎ গুণটি আছে। প্রথমেই পরিচয়পালা শেষ হোক। আমরা গ্রামেই থাকি। পাঁচ বোনের নামগুলো হলো, মেহেরুন, মিরু, মুনা, মিশু,মাহী।

সবারই এগুলো ডাকনাম আর ভালো নাম আছে। বড় আপা গায়ের ধরণ শ্যামলা। কালোও বলা যায়। সে আমার থেকে তিন বছরের বড়। অর্নাস করছে। তার পাত্র দেখা হচ্ছে। ভালো পাত্র পেলেও এই সাদা চামড়ার বাজারে মেয়ে পাড় করা অনেক কঠিন কাল। কিন্তু আমরা বাকি চার বোন বেশ সুন্দরী। টানা টানা চোখ, লম্বা চুল। নাক, মুখ, ঠোট সবইতেই সাহিত্যগত বর্ণনা দিতে পারবে। একবার ঢাকা থেকে বিরাট সমন্ধ এসেছে। মিনু বুবু তখন ইন্টার শেষ করেছে, অর্নাসে ভর্তি হবে । মিনু বুবুকে দেখতে এসে, তারা বলে বসলো, ” আপনার মেজো মেয়ের নাম জানো কি বললেন? “

” তার নাম মাহিরা আক্তার। আমরা মিরু ডাকি, এই মিরু এইদিকে আয়, সালাম দে ” – বাবা

“তা মা, তুমি কি পড়ছো? ” — পাত্রের বাবা।

” জিহ আংকেল, আমি ইন্টার পরীক্ষা দেবো এইবার। “

” ভাইসাব, আপনি দেখেন, এইসব হাতপাখার গায়ে হাতেরকাজ আমার বড় মেয়ে মেহেরুন আক্তার মিনু করেছে, ছোট থেকে সব কাজে পারদর্শী আমার মেয়ে! ” – বাবা

” ভাইসাব, আমাদের আপনার মেয়েকে পছন্দ হয়েছে। “

” আলহামদুলিল্লাহ “

” কিন্তু বড় মেয়ে নয়, মেজো মেয়ে মাহিরাকে আমাদের বেশ ভালোলেগেছে। আপনারা যদি চান তাহলে তাকে আজই বউ করে নিতে চাই। “

বাবা তখন জবাব দিলেন না। সেদিন বড় বুবু উচ্চভাবে বললো, “দেখো ছেলে ভালো, আমার কিন্তু আপত্তি নেই, মিরু ভালোই থাকবে। “

তারপর মিরুও আপত্তি করলো না। বিয়ে হয়ে গেলো। ইন্টার পরীক্ষা অবধি মিরু আমাদের সাথেই ছিলো। তারপর ইন্টারের পরে বিদায় হলো। অবশ্য মিরু এইবাড়িতে থাকাকালীন দুলাভাই অনেকবার এসেছে । মিরু আমার থেকে দু বছরের বড়। মিরু কিছুদিনের মধ্যেই মা হলো। মিরুর মেয়ের নাম রাখা হলো মুমু। মিরুর আর পড়াশুনা হলো না। আমার বাবা নিজের জীবনের অন্যতম কিছু ভুলের ডায়েরী লিখেন। সেখানে মিরুর বিয়ে দেওয়া আছে। মিরু লেখাপড়ায় ভালো ছিল। ওইযে সুন্দরি হওয়া বড় ভুল। বাবার লেখাগুলো চুপিচুপি পড়ি মাঝে মাঝে মজা লাগে মাঝে মাঝে অনেক কষ্ট হয়। মিরুর ব্যাপারটা নিয়ে আমারো কষ্ট হয়। মিরু সাথে আর গোল্লাছুট খেলা যাবে না। স্কুলের ফেয়ার ওয়েলে মিরু যেভাবে আমায় সাজিয়ে দিয়েছিলো সেরকমভাবে কাজল দিয়ে দেবে না। চুলে ফ্রান্স বেনীর সহজ উপায় নিয়ে কেউ বক্তব্য পেশ করবে না। চার বোনের মধ্যিখানে মাহীকে রেখে ঘুমানো আর হবে না। মিরুর মেয়ে ওর মতোই পুরো। ইদ ছাড়া মিরুর দেখা আমরা পাই না। তাও আবার শুধু রোজার ইদে এসেছে একবার, কুরবানী ইদে নাকি তার শ্বশুর বাড়ি অনেক কাজ। উপস্থিত থাকা উচিত। আমরা একে কনেপক্ষ, দুয়ে নিম্নবিত্ত। দাদার আমলে নাকি অনেক সম্পত্তি ছিল, এখন কিছু নেই বললেই চলে।

—কিরে কি লিখছিস — (মিনু বুবু)

বুবুর হুট করে গলায় আওয়াজে আমি হতবাক করে তাড়াতাড়ি ডায়েরীটা বন্ধ করে ফেলি।

–না, বুবু কিছু না, এইভাবেই লিখছিলাম। (আমি)

— হুম। সব গুছিয়েছিস?!

–হু

–খাতাপত্র, সার্টিফিকেট?

–হুম।

–ব্রাশ, পেস্ট নিয়েছিস?

–হুম।

–আর জামাকাপড়?

–নিয়েছি, নিয়েছি। আর না নিলেও কি মিরুর আছে না সব!

— ধ্যাত, পাগল, মিরু জামা কেন পড়বি?

— সুন্দর সুন্দর জামা, দেখতে ভালো লাগে। আর অন্য কারোরটা পড়বো না, বোনেরটা পড়বো! অবশ্য মিরু এই দুই বছরে যে মোটা হয়েছে। ওরি বাব্বা।

আমি গাল ফুলিয়ে মোটা হওয়ার মতো করছি। বুবু হেসে দিলো । এতোক্ষন আমি ডায়েরীতে লিখছিলাম। আর আজ ডায়েরী লেখা গেলো না। একা একা ডায়েরী লেখা যায়, কিন্তু সবার সামনে কেমন জানো লজ্জাবোধ হয়। যেন চুরি করছি আমি। আমরা চার বোন একসাথেই গুটিসুটি হয়ে ঘুমাই। মাহীর বয়স এখন তিন বছর। কাল আমি ঢাকা যাচ্ছি। মিরুর বাড়ি। মাহীকে রোজ বিকেলে নদীরপাড়ে হাটতে নিয়ে যাওয়া হবে না। গাছের পেয়ারা গুলো দেখিয়ে গোনা শেখানো হবে না। মিশুকে পড়া দেখানো হবে না। মিশু এইবার টেনে পড়ে। আমার চেয়ে বছর তিনেক ছোট। কাল যাচ্ছি আমি এক অচেনা শহরে যেখানে লুকিয়ে বাবার ” আমার জীবনের কতিপয় ভুলসমূহ “নামক ডায়েরীটা পড়া হবে না। মায়ের হাতের কান মলানী খাওয়া হবে না। আমিও একটা ডায়েরী লিখবো, যেখানে অচেনা শহরকে ধীরে ধীরে চেনার ব্যাপারটা লিখবো। অবশ্য সেখানে ছোট্ট মুমু আর প্রিয় বোন মিরু আছে। আমি যাচ্ছি অর্নাস প্রথম বর্ষে ভর্তি হতে। মিরু একা মুমুকে নিয়ে সামলাতে পারে না। তাই আমাকে সেখানের কলেজে ভর্তি করিয়ে দেবে। ঢাকার কলেজ নাকি নামিদামি তাই বাবাও না করলো না। পড়াশোনা করবো আর মুমুকে দেখবো সিম্পল কাজ।

পরদিন সকালে আমি রেডি হয়ে নেই। বাবা রিকশা করে বাস স্ট্যান্ডে নিয়ে যায়। তারপর দেখেশুনে এক বৃদ্ধ মহিলার পাশে বসিয়ে দেয়। অনেক সিনেমায় দেখা যায়, বাসে পাশাপাশি ছেলেমেয়ে বসে তারপর প্রেম। আমার মা বাবা অতন্ত্য বুদ্ধিমান। এই টাইপের ভুল কখনো করবেন না।

চলবে

আরো পড়ুন: দুর্গাপূজায় শাকিবের মুখোমুখি অপু বিশ্বাস

আরো পড়ুন: পুতুল বিয়ের প্রবণতা বাড়ছে জাপানি তরুণদের