মুনার অচেনা শহর | শেষ পর্ব

সেদিন মিশুকে কিভাবে বোঝোব নাকি শাসন করবো কিছু বুঝতে পারছিলাম না। আসলে আমি সাধারন একটা মেয়ে। মিশুর প্রেম কাহিনীর স্বীকৃত করাটা ছিল অসাধারণ। আর তাছাড়া আমি মোটামুটি অবাধ্য টাইপের মেয়ে। তো সমস্যাটাকে আমি সমাধান দিতে পারব না। কারণ অর্নবকে ভুলতে বললে আমাকে সীমান্তকে ভোলার কথা উঠবে। এমন পরিস্থিতিতে পরতে হবে ভাবিনি। স্কুল ছুটি হবার পরে বিকেলবেলা তাই বড় বুবুর কাছে যাওয়া দরকার। তার উপর ছেড়ে দিয়ে আসি ব্যাপারটা। বড় বুবু এখন পুরো সংসারী। সাইদ দুলাভাইয়ের বড় বড় প্রাসাদ অনেকগুলো। সেগুলোকে বিল্ডিং বললে ভুল হবে। আমাদের বলেছিল সেখানে থাকতে। আমার মা নারাজ। মেয়ের সংসারে যাবে কেন? দরকার কি? মেয়ের ঘরে পানি খাওয়ারও নিয়ম নেই! আমি থাকব! হয় না, লোকে কি বলবে।

আসলে তার মতন আমি আর মিশু হয়নি। হলে আমার বিয়ে ভাঙ্গার পর জীবিত থাকতাম না, আর মিশু অন্য ধর্মের ছেলের প্রেমে মজতো না। শুধু দোয়া করি মাহী যেন এমন না হয়। সে যেন বড় বুবুর মতো হয়। ম্যাজিক জানা একটি কন্যা। যার গুণের কথা লিখে শেষ করা যাবে না। আমি বড় বুবুর বাড়িতে বসে আছি। ইয়া বড় লিভিং রুম। সোফার এক কোণে অনেকটা জড়োসরো হয়ে বসে আছি। পাভেল আর হিমেল আমাকে দেখে ছুটে এলো।

— কেমন আছো তোমরা? কে যেন পাভেল? তুমি।

— না, আমি হিমেল। আমার প্রিয় রং লাল। দেখো তাই আমি লাল গেঞ্চি পড়েছি। ( হিমেল)

— হুম, আমারও প্রিয় রং লাল, কিন্তু লাল গেঞ্চি আমার নেই। মা বলেছে আজ কিনে দেবে। ( পাভেল)

— আচ্ছা, তোমাদের জন্যে চকলেট এনেছি। নাও।

— তুমি পাভেলকে দাও। আমি চকলেট খাইনা। ( হিমেল)

— কেন?

— দাঁতে পোকা হয়! জানো না তুমি খালা! মা বারন করেছে।

— আমিও খাই না খালা।

কিন্তু পাভেলের অনেক মন চাইছে চকলেটগুলো খেতে। দেখে মন হচ্ছে, কোনো কালে চকলেট ফেভারেট ছিল, এখন মা’র ফেভারিট।

— আচ্ছা, তোমার মা কই!

— দাদুকে ঔষধ খায়িয়ে দিচ্ছে। ( হিমেল)

— ওহ!

— খালা, হিমাওয়ারী, নামটা কেমন? ( হিমেল)

— ভালো, কার নাম?

— আমার ছোট বোনের নাম। আমি ঠিক করেছি। আমার এক বন্ধুর ছোট বোন আছে। হিমাওয়ারীর মতো। সিনচানেরো বোন আছে। তাই আমারো বোন চাই। ( হিমেল)

— হুম তাই হিমেল সাথে হিমাওয়ারী রেখেছো? বাহ মিলেছে।

— খালা, আমি আমার বোনের জন্য নাম রেখেছি। (পাভেল)

— কি নাম?

— পিমাওয়ারী। সুন্দর নাম না বলো?

— হুম সুন্দর।

বুবু এর মধ্যে চলে এলো।

— আয়, মুনা, ভেতরের ঘরে আয়।

আমি বুবুকে বললাম,

— কি বুবু, সুখবর কবে দিচ্ছো?

— মানে!

— তোমার ছেলেরা ওদের বোনের নাম ঠিক করে আমায় শোনাচ্ছে।

— আর বলিস না। আমি কিছুক্ষন আগে ওদের দাদার ঘরে গিয়েছিলাম না! উনি প্যারালাইজড। শুধু কথা বলতে আর শুনতে পারেন। আমায় বললো, ” দোয়া করি, তোর এক মেয়ে হোক, আমার নাতনীর নাম হবে হুরপরী। কেমন হবে বৌমা! সেখান থেকে মনে হয়, শুনেছে।

— হতে পারে। কিন্তু নামগুলো ওদের নামের সাথে মিলিয়ে রাখছে।

— হেহে, বাচ্চাকাচ্চার খেলা। আরকি।

— আপা, আসলে একটা কথা বলতে, এসেছি।

— বল, শুনি।

তারপর কাল রাতের মিশুর ঘটনা বুবুকে শোনালাম। সে কিছুক্ষন চুপ করে ছিলো। তারপর আলমারি থেকে কি একটা বের করছে। একটা পুরোনো ডাইরি।

— মুনা, এই ডাইরি চিনিস?

আমি ভালোভাবে দেখি। হুম এটা তো বাবার ভুল ধরা ডায়েরি। বাবা প্রায়ই নিজের ভুলগুলো লিখতো। আমি চুপিচুপি পড়তাম। কখনো শেষ করা হয়নি।

— মুনা, আমি যৌতুক হিসেবে এই ডায়েরি খানাই নিয়ে আসি। বাবা মারা যাওয়ার আগে এই ডায়েরীটা আমায় দিয়ে গেছিলেন।

— কেন?

— জানি না। তখন বাবা অসুস্থ, তাই প্রশ্ন করি নাই। এখন বাবা নেই। প্রায়ই মন খারাপ হলে ডায়েরিটা পড়ি। মনে হয়, বাবা সেদিন লিখেছে। লেখাগুলো ছুয়ে দেখি। এই আরকি।

আমি ডায়েরী খুললাম, সেখানে বড় ভুলের যায়গাটাতে মাহীর জন্ম দেওয়া, তারপর সেখানে আমাকে শহরে পাঠানো। পাশে লেখা, মায়মুনাকে আমি ভালো ভবিষ্যৎ দিতে শহরে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু আজ সে অচেনা শহরে চেনা মানুষের জন্য ব্যস্ত। কিন্তু চেনামুখগুলোর ভাবনা তার কাছে অচেনা।

পড়লাম। কয়েকবার পড়লাম। এর মানে আমি বারবার নিজের কথা ভেবেছি। কখনো বাবার কথা শুনেনি। মিরু শুনেছে, শুনে জীবনে কি করতে পেরেছে। তার পায়া না পায়াতে আমার জীবন কাহিনী ভেবেছি। বাবার কথা শুনলে সে হয়তো আরো কিছু দিন বেচে যেতেন।

— মুনা , কিছু বুঝলি?

— হু।

— মিশুর কোনো দোষ দেখছি না। প্রেম আসতে পারে জীবনে, তাই বলে একজনের নামে বিয়ে না করার শপথ নিবি?

— তুমি তাহলে এই কদিন বিয়ে কেন করনি?

— আমার এদেরকে মনেই হয়নি, আমাকে প্রয়োজন। শুধু মনে হয়েছে বিয়েটা তাকেই করতে হয় যে তোমার জন্য প্যারফেক্ট। সেখানে সাইদ প্যারফেক্ট। তখন না বুঝলে এখন বুঝি।

— আমি কিভাবে বুঝবো?

ওয়েট, বুবু আবারও আলমারী থেকে একটা চিঠি বের করলো।

— খাম তো আটকানো। কার চিঠি

— জাহিদ কিবরিয়া আমাকে দিয়েছিলো। অনেক আগে। তুই তাকে সহ্য করতে পারিস না। তাই দেই নি। আমিও খুলি নি। এখন খুলতে পারিস।

আমি খুললাম চিঠিটা এমন ছিল-

প্রিয় মায়মুনা,

আপনি কি আবারও আমাকে লম্পট ভাবছেন? আসলে, আপনার কথা আমি কাল ভেবেছি, আজ ভাবছি। আপনার প্রতি ঘৃনা নেই, যারা ঘৃনা করে তাদের প্রতি আক্ষেপ জমছে! আসলে ভুল কি আপনার? না। তাহলে ভুল আমার? সেটাও না। আমি খুব সাধারন, তাই সীমান্তের মতো রাস্তায় একবার দেখার জন্যে দাঁড়িয়ে থাকতে পারব না। আপনাকে বিরক্ত করতে পারব না। রাগ করে হাত কেটে বৈবাগী হওয়াও আমার কর্ম নয়। তাহলে কি? আসলে কি আপনাকে ভালোবাসতে পারব? আপনি বলেছিলেন, ভালোবাসা নাকি দামী। সবাইকে ভালবাসা যায় না। আমি অনেক ভেবেছি এটা ভুল কথা। ভালবাসা সবচেয়ে সস্তা এক জিনিস। অনেক সস্তা। আপনি চাইলে একটা কুকুরের ছানাকে দুই মিনিট দেখে ভালোবাসতে পারেন। আবার যে কাউকেই ভালোবাসা কঠিন কিছু নয়। কিছু ভুল লিখলে ক্ষমা করবেন!

ইতি, জাহিদ কিবরিয়া

ভালবাসা সস্তা খুব সস্তা। হতে খুব বেশি সময় নেয় না।

— মুনা,

— হুম।

— আরো একটা আছে। লাগবে?

— না, বুবু। সে এক কথাই বলবে।

— মিশুকে যদি প্রমাণ করতে যাস, তাহলে তোর নিজেকে প্রমাণ করতে হবে।

–উনাকে বিয়ে করলে কি সবকিছু সমাধান হবে?

— বিয়ের মানেই হচ্ছে তুমি সীমান্ত থেকে অসীমে পা দিচ্ছ। তুমি যদি আজ বিয়ে না করো তাহলে মিশুও এমনটা করবে। তাই বুঝে শুনে কাজটা করো।

বাড়িতে চলে আসলাম। মাথায় অনেক চিন্তা। মিশুকে বোঝাতে হলে আগে আমায় বুঝতে হবে। ভালোবাসা সস্তা, সবাইকেই ভালোবাসা যায়। শুধু সময় দিতে হয়। জাহিদকে বিয়ে করলে মা রোজ আর টেনশন করবে না। মিশুকে বোঝানো যাবে প্রেম জীবনের মূল বিষয় নয়। অন্ধকারের পরে যেমন আলো হয় তেমনি, কেউ এসে হাত ধরে, ডুবন্ত থেকে পাড়ে তুলে।

বুবুকে ফোন দিলাম, আমি এই বিয়েতে রাজি। বিয়ের সব আয়োজন আবারো হচ্ছে। এইবার শুধু সব সময় জাহিদ ফোন দিচ্ছে। ধীরে ধীরে সময় এগোচ্ছে। কাল যে আমার বিয়ে। আবারো গায়ে হলুদের পালা শেষ। জাহিদ দেখি সাত বার ফোন দিয়েছি।

— আপনাকে একটি প্রশ্ন করার ছিলো?

— করুন!

— আপনি কি বাধ্য হয়ে আমায় বিয়ে করিছেন?

— না হলে কি সীমান্তের মতো আপনিও বিয়ে করবেন না আর। এই খানেই সমাপ্তি ঘোষণা করবেন।

— আপনি ভুল কেন বোঝেন!

— ঠিক বুঝি।

— আচ্ছা আপনি ঠিক বোঝেন!

— সরি বলুন!

— কেন!

— আচ্ছা বলবেন না, ফোন রাখলাম।।

— আচ্ছা আচ্ছা সরি।

এইবার খুব হাসি পাচ্ছে আমার। জাহিদকে যাই বলি সে তাই করে। তার সরি শব্দটা আমার প্রিয়। কেন জানো তার মুখে শুনতে ভালো লাগে। তার মানে কি? সত্যি ভালোবাসা সস্তা?! আমি হাসছি।

— হাসছেন কেন?

— এমনি। আচ্ছা রাখি। কাল আসবেন তো?

— আপনি বললে, এখুনি আসতে পারি।

— দরকার নেই। এখন আসার।

রাখছি। ঘুম আসছে। এখন আমার রাত জাগার অভ্যাস নেই। কারো কারনে অভ্যাস হয়েছিল। আজ থেকে আমি মুক্ত। জীবনটা সাক্রিফায়িসে খারাপ লাগে না।

তারপর বিয়ে সন্ধ্যায়। কালেমা বলে, বিয়ে সম্পন্ন হলো। কবুল শব্দটার মর্মকথা বুঝলাম। বিদেয় নেওয়ার আগে মিশুকে বললাম, “জানিস মিশু ভালোবাসা সস্তা। চাইলে যে কাউকেই ভালোবাসা যায়! “

সমাপ্ত

আরো পড়ুন: কমিয়ে আনুন প্লাস্টিকের ব্যবহার