এবার চট্রগ্রামে ধরা পরলো ভয়ঙ্কর দানব

চট্রগ্রামে এবার ধরা পরলো এক ভয়ঙ্কর দানব। অসাধারন ক্ষমতা তাঁর, মানুষের জন্ম পরিচয় বদলে দিতে পারে এই দানব। আবার মৃত মানুষকে বাঁচিয়ে তোলা তো তাঁর বাঁ হাতের খেলা। এমনই এক দানবকে গত রোববার চট্রগ্রামের থানা পুলিশ গ্রেফতার করেছে। দানবের নাম জয়নাল আবেদীন। রোহিঙ্গা নাগরিকদের জন্ম পরিচয় বদলে তাদের আদি আসল বাংলাদেশী করে দিতেন তিনি। মরা মানুষের পরিচিতি নম্বরে অন্য একজন বেঁচে থাকতেন তাঁর আশ্চর্য যাদুকরী ক্ষমতায়। এই ক্ষমতার যাদুকাঠি হচ্ছে একটা ল্যাপটপ।

জয়নালদের পৈতৃক বাড়িটি আশকরিয়া পাড়ার ভেতরে। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি বড়। ছোট ভাই জসিম উদ্দিন বিদেশফেরত। দুই বছর আগে জয়নাল তাঁদের পৈতৃক বাড়িটি পাকা করেন। সেখানেই মা-বাবা স্ত্রী ও ভাইকে নিয়ে থাকেন।

গতকাল দুপুরে জয়নালের পৈতৃক বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তালা দেওয়া। এক প্রতিবেশী জানান, সকালে মা-বাবাসহ সবাই চম্পট দিয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা হাবিবুর রহমান জানান, বছরখানেক আগে আশকরিয়া মাজারসংলগ্ন এলাকায় সাড়ে তিন গন্ডার (৭ শতক) একটি প্লট কেনেন জয়নাল। গন্ডাপ্রতি ছয় লাখ টাকা দরে কেনা এই প্লটে ছয় মাস আগে পাঁচতলা বাড়ি তোলার কাজ শুরু করেন তিনি। এটি এখন গ্রামের সবচেয়ে বড় ভবন। গতকাল সরেজমিনে দেখা গেছে, বাড়িটির চতুর্থ তলার ছাদ ঢালাই শেষ হয়েছে। রড সিমেন্ট ইট ভেতরে মজুত করা রয়েছে।

এ ছাড়া পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডে জয়নাল চার গন্ডার আরেকটি প্লট কিনেছেন বলে জানা গেছে।

জয়নালের বাবা আবদুল মোনাফ একসময় মাছের ট্রলারের শ্রমিক ছিলেন।

২০০৪ সালে নির্বাচন কমিশনে অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ পাওয়া জয়নাল আবেদীনের এত উত্থানের পেছনে ছিল কমিশনের এই ল্যাপটপ। এটি ব্যবহার করেই তিনি বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন বলে মনে করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। জয়নাল একা নন, এই চক্রের সঙ্গে রয়েছেন আরও কয়েকজন। নির্বাচন কমিশনের ঢাকাসহ বিভিন্ন অফিসে জয়নালের অন্তত ১০ স্বজন কর্মরত রয়েছেন। এলাকার অনেকের অভিযোগ, রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও পাসপোর্ট তৈরি করে বিদেশে পাঠাতেন জয়নাল ও তাঁর ভাই জসিম উদ্দিন চৌধুরী।

বাঁশখালী পৌর সদরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. হারুন বলেন, নির্মাণাধীন বাড়িটি জয়নালের। কয়েক বছরেই কয়েক কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তিনি রোহিঙ্গাদের ভোটার করে ভাইয়ের মাধ্যমে বিদেশে পাঠান।

গত ১৮ আগস্ট স্মার্ট কার্ড তুলতে গিয়ে লাকী আকতার নামের এক রোহিঙ্গা নারী চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কার্যালয়ে ধরা পড়েন। এরপর তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। এরপর থেকে কীভাবে নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে রোহিঙ্গাদের ভুয়া এনআইডির তথ্য প্রদর্শিত হচ্ছে, তা নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। কমিশনের পাশাপাশি পুলিশ ও দুদকও তদন্তে নামে।

নির্বাচন কমিশনের তদন্ত দল সোমবার চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ে ডবলমুরিং থানার পাঁচজন কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তাঁদের মধ্যে জয়নালের মুঠোফোনে রোহিঙ্গা ভোটার-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে জয়নাল রোহিঙ্গাদের ভোটার করার বিষয়টি স্বীকার করেন। এরপর তাঁর বন্ধু বিজয় দাসের কাছ থেকে খোয়া যাওয়া একটি ল্যাপটপও উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তার করা হয় বিজয় দাস ও তাঁর স্বজন সুমাইয়া আকতারকে।

নির্বাচন কমিশনের তদন্ত দলের প্রধান উপপরিচালক ইকবাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, উদ্ধার হওয়া ল্যাপটপ থেকে অনেক তথ্য তারা মুছে দিয়েছে। এরপরও কিছু সঠিক এনআইডির পাশাপাশি ৫১টি ভুয়া এনআইডি পাওয়া গেছে। এই ৫১টি রোহিঙ্গাদের বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে।

আটক তিনজনসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় সোমবার রাতে মামলা করেন ডবলমুরিং থানা নির্বাচন কর্মকর্তা পল্লবী চাকমা। গ্রেপ্তারকৃত তিনজন ছাড়া সাগর (৩৭) ও সত্য সুন্দর দে (৩৮) নামের দুজনকে আসামি করা হয়। এই দুজন ২০০৭ সালে ঢাকায় নির্বাচন কমিশনের এনআইডি সার্ভারে তথ্য আপলোডের কাজ করতেন।

কোতোয়ালি থানার ওসি মোহাম্মদ মহসীন বলেন, সাগর এনআইডি সার্ভারে তথ্য আপলোড করতেন। তাঁর কাছে দেশের সব উপজেলার এনআইডি আপলোডের পাসওয়ার্ড আছে। বর্তমানে তিনি বিআরটিএতে কর্মরত। সত্য সুন্দর ডেটা এন্ট্রি এক্সপার্ট। ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকায় একটি এনআইডি করে দিতেন। মামলাটি কাউন্টার টেররিজম ইউনিট তদন্ত করছে বলে জানান ওসি মহসীন।

আরো পড়ুন: কোকিল কন্ঠি লতার অন্দর বাহির