ডাক্তাররা কি মানুষ!

সারাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকলে, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক প্রবাহ বিশ্বাস নাওয়া খাওয়া ভুলে কাজে লেগে পরেন। প্রতিদিন শত শত রোগী ভিড় করতে থাকে এই হাসপাতালে, বাড়তে থাকে কাজের চাপ। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে ১৫ দিন পর তিনি নিজেই আক্রান্ত হন ডেঙ্গুজ্বরে।

আগষ্টের দুই তারিখ সন্ধ্যায় আমার মেয়ে অনাদি ফোন করে জানাল যে, ওর বন্ধু মিম প্রচন্ড কান্নাকাটি করছে, তাঁর নাকি আজ ৫/৬ দিন ধরে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর সাথে মাথা ব্যাথা। আজ সারাদিনে ওর ৩/৪ বার বমি হয়েছে। আমি যেন সম্ভব হলে ওকে একটু সাহায্য করি। মিম ঢাকায় হোস্টেলে  থেকে একটি বেসরকারি কলেজে পড়ে, ওর স্থানীয় অভিভাবক আমি। চিন্তায় পরে গেলাম। মিমকে ফোন করতেই ও প্রচুর কান্নাকাটি করতে লাগলো, বুঝতে পারছি মেয়েটি প্রচন্ড ভয় পেয়েছে। ওকে ধানমন্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে আসতে বলে আমি অফিস থেকে রওনা হই।

বেসরকারি ঐ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে তখন একজন ডাক্তার এবং একজন সেবিকা ছিলেন। তিনটি বিছানার সবগুলোতেই জ্বরে আক্রান্ত রোগী। মিমের সাথে ওর এক বন্ধু এসেছে। ওদেরকে বললাম যে, এখানকার চিকিৎসা ব্যবস্থা আমার কাছে পর্যাপ্ত মনে হচ্ছেনা। আমি ওকে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে চাই।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে যাওয়ার আগে অভ্যাসবশতঃ আমার এক পরিচিত বড়ভাইয়ের কাছ থেকে ডা. প্রবাহ বিশ্বাসের ফোন নাম্বার নিয়ে ফোন করে জানতে পারি যে, তিনি নিজেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। তারপরও তিনি আমাকে অনুরোধ করলেন যে, আমি যেন ওখানে গিয়ে ডাক্তার এবং নার্সদের তাঁর কথা বলি। রাত সাড়ে এগারটা বাজে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রোগীর ভিড়। প্রায় সবাই জ্বরের চিকিৎসা নিতে এসেছে।

একটা হুইল চেয়ারে বসিয়ে মিমকে জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলাম। কাঠের লম্বা টেবিলের ওপাশে কয়েকজন নবীন ডাক্তার রোগীদের সামলাচ্ছেন। সবাই প্রচন্ড ব্যাস্ত। ব্যাথাতুর মিমের কষ্টের শব্দশুনেই কিনা কে জানে একজন ডাক্তার এগিয়ে এসে মিমের রোগের বিবরন নিতে শুরু করলেন। ব্যবস্থাপত্র লিখে প্যাথলজি টেষ্ট করার জন্য হাসপাতালের ১১০ নাম্বার কক্ষে যেতে বললেন।

এবার বিষ্ময়ে অবাক হওয়ার পালা। বাইরে থেকে যতটা পরিচ্ছন্ন মনে হচ্ছিল ভেতরে ততটাই গোলমেলে অবস্থা। সদর দরজার চৌকাঠ পার হলেই বিছানা, মেঝে সব জায়গায় শত শত রোগী ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। প্রায় সবাই ডেঙ্গু রোগী। অবস্থা ভয়াবহ।

স্বাস্থমন্ত্রী জাহিদ মালিক ডেঙ্গুর ভয়াবতা আঁচ করতে পেরে শুরুতেই সবার ঈদের ছুটি বাতিল করে দিলেন। এমন একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়ে সেই তিনিই কিনা সপরিবারে চলে গেলেন মালয়েশিয়ায় ছুটি কাটাতে! তীব্র সমালোচনার মুখে ছুটি কমিয়ে দেশে ফিরে এসে সাংবাদিকদের জানালেন না যে, কেন তিনি মালয়েশিয়ায় গিয়েছিলেন। গণমাধ্যম মারফত জানতে পারি, এক সাংবাদিক প্রশ্ন করলে তিনি তাঁকে ধমক দিয়ে অন্য কোন প্রশ্ন থাকলে করতে বলেন। ঢাকা দক্ষিণের মেয়র শুরুতেই জানিয়েদিলেন, ডেঙ্গু একটা গুজব। পরিস্থিতি যতটা নাজুক বলা হচ্ছে বাস্তবতা ততটা নয়। তার মানে সরকারের দায়িত্বশীল অংশ পরিস্থিতি হালকা করে দেখতে ও দেখাতে চান। এমন পরিস্থিতিতে ডাক্তারদের তো পোয়াবার হওয়ার কথা। তাঁরা একটু সহযোগীতা করলেই পরিস্থিতি যে গুরুতর নয় তা বোঝান সহজ হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের ডাক্তাররা সে সুযোগ না নিয়ে নিজেদের বিপদ হতে পারে জেনেও ভয়াবহ এই মারণ রোগের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন। অথচ আমাদের জাতীয় গণমাধ্যম কান্ডজ্ঞানহীন রাজনীতিবিদদের তোয়াজ করে সার্বক্ষনিক পরে আছে ডাক্তারদের পেছনে।

আবারও আসি সেই সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। হুইল চেয়ারে মিমকে বসিয়ে আবার ছুট লাগালাম। গন্তব্য ১১০ নাম্বার কক্ষ। প্যাথলজির এই বিভাগটি একটু ভেতরের দিকে। চারিদিকে রোগীর ছড়াছড়ি। ঘরের মেঝে, বিছানা, বারান্দা সব জায়গায় গাদাগাদি করে শুয়ে আছে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগী। প্যাথলজির কাউন্টারের সামনে এই মাঝরাতেও বেশ ভিড়। দুজন ল্যাব সহকারী ব্যস্ত সময় পার করছেন। কাজ করছেন দ্রুত হাতে। টিকেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি সিরিয়াল দেবার জন্য। তখনই কানে এলো ল্যাব সহকারী একজনকে বলছেন ৫১০ টাকা দেন। আমার কান খাড়া হয়ে গেল, টেষ্টের জন্য তো টাকা লাগার কথা নয়। টাকাটা বুঝে নিয়ে তিনি সমপরিমান টাকার সরকারী রশিদ রোগীকে ধরিয়ে দিলেন। পাশে থাকা একজন মহিলা জিজ্ঞেস করলেন, ডেঙ্গু টেস্টের জন্য কত টাকা লাগবে? ল্যাব সহকারী বিনয়ের সাথে জানালেন, কোন টাকা লাগবে না। ডেঙ্গু টেষ্ট ফ্রি। মিমের টেষ্ট হয়ে গেলে রিপোর্ট নেয়ার জন্য আমাদের একটু অপেক্ষা করতে বললেন।

এর মধ্যেই হইচই। বিষয়টা কি জানার জন্য এগিয়ে গেলাম। একটা বাচ্চা মেয়ে এসেছে প্রচন্ড জ্বর নিয়ে। মেয়েটির ঠোঁটের দুইপাশে হালকা রক্তের দাগ। ল্যাব সহকারী মেয়েটির অবস্থা বিবেচনা করে ল্যাবের ভেতরেই একটা চেয়ার বসিয়ে রক্ত নিচ্ছে।

  • ভাই রিপোর্ট কখন পাওয়া যাবে?
  • আজকে হবে না। কাল এগারটা নাগাদ। ওর অনেকগুলো পরীক্ষা হয়েছে।
  • আজকেই একটু দেয়ার ব্যবস্থা করেন।
  • ভাই (রেগে গিয়ে) আপনারা যান তো।
  • পারবেন না, ভাল কথা। এত রেগে যাচ্ছেন কেন?
  • (এবার হাসিমুখে) ভাই সকাল আটটা থেকে শুরু করেছি, এখন রাত সাড়ে এগার। আমরাও তো মানুষ!