সেই সন্ধ্যায়!

image

১৯৮৪ সালের কথা, আমি তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। ৩১শে অক্টোবার, বুধবার, কেমিস্ট্রি ল্যাব ফাঁকী দিয়ে দুপুরের বাসে শাহীন, শওকত, ফরিদা আর আমি সাভার থেকে ঢাকা গুলিস্তান হলে সিনেমা দেখতে এসেছিলাম। সিনেমার নাম মনে নেই, ৩টার শো’তে সিনেমা দেখে হল থেকে বের হয়েছি, সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার বাসে চড়ে হোস্টেলে ফিরে যাব, চারজনে ফুটপাথ ধরে হাঁটা দিয়েছি, কিন্তু চারদিকে কিসের গুঞ্জন, হুশ -হাশ, ফিস -ফাস, পথচারীদের মধ্যে চঞ্চলতা!

আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো, কেমন ভয় লাগলো, শাহীন একটু এগিয়ে গেছিল, ঘুরে আবার আমাদের কাছে চলে এলো, এসেই বলল, ” ইন্দিরা গান্ধীকে মেরে ফেলেছে”।

আমি বললাম, ” কি?? ইন্দিরা গান্ধী, কোন ইন্দিরা গান্ধী?”

শাহীন বলে, ” ইন্দিরা গান্ধী আবার কয়টা আছে? ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে মেরে ফেলেছে। তাড়াতাড়ি হাঁটা দাও, বাস ফেল করলে বিপদে পড়বো”।

আমি আর ফরিদা এই সংবাদে স্তব্ধ হয়ে গেলাম, ফরিদা রাজনীতি-টিতি নিয়ে মাথা ঘামাতোনা, ও ছিল শুধুই ইন্দিরা ভক্ত। ইন্দিরা গান্ধী নামটা উচ্চারণ করতো কেমন এক ধরণের মুগ্ধতার সুরে, দুই বন্ধু হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলাম।

ফরিদা খুব শান্ত স্বভাবের ছিল, কথা কম বলতো, বলল, ” হায় আল্লা! এরা কি মানুষ? এমন একজন প্রধানমন্ত্রীকে মেরে ফেলতে পারলো? ছি ছি ছি!”

শাহীন সংবাদ নিয়ে এলো, সকালে উনার দেহরক্ষীর গুলীতে নিজ বাড়ীর গেটেই উনি লুটিয়ে পড়েন, সাথে সাথে মৃত্যু হয়নি, পরে মারা গেছেন।

আমার মাথায় আর কিছুই ঢুকছিলনা, ভীষণ ভয় করছিল, মনে হচ্ছিল, আশেপাশের মানুষজন সকলেই একেকটা খুনী। এরা বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলতে পারে, এরা ইন্দিরা গান্ধীকে মেরে ফেলতে পারে, স্বপ্ন কারিগরদের সবাইকেই এরা মেরে ফেলে।

বিভ্রান্তভাবে আমরা দ্রুত পায়ে হাঁটছি, আমি তখন কল্পনায় দেখি আমার বাবার মুখ। ইন্দিরা ছিলেন বাবার চোখে আদর্শ নারী, রূপে, গুণে, তেজে, বিক্রমে সেরার সেরা । বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু! আমার বয়স যখন চার বা পাঁচ, তখন থেকে ইন্দিরা গান্ধী নামের সাথে আমার পরিচয়। আমার ছিল মাথা ভর্তি ঘন কোঁকড়ানো চুল, বাবা বলতো, ইন্দিরা গান্ধীর মত চুল।

মাসে একবার নাপিতের কাছে নিয়ে গিয়ে বাবার ভাষায় ‘ইন্দিরা কাট’ করিয়ে আনা হতো, রবিবারের দুপুরে বাবা নিজ হাতে শ্যাম্পু করিয়ে দিতেন, অনেক যত্ন করে ভেজা চুল মুছিয়ে ঝরঝরে করে শুকিয়ে আমাকে নিয়ে বসতেন হাজার বছরের পুরনো কাঠের টেবিলের পাশে। টেবিলের ড্রয়ারের তালা খুলে বের করতেন ‘হেয়ার ক্রিম’।

সাদা ক্রিমের বোতলটা ছিল আমার দুই চোখের বিষ, কারণ এই বোতল থেকে আঙ্গুলে করে মেপে মেপে ক্রীম নিয়ে আমার চুলে মাথতেন, প্রায় মিনিট পনের ধরে এই কাজটি উনি করতেন, আমাকে মাথা নীচু করে বসে থাকতে হতো। ঘাড় ব্যথা হয়ে যেত বলেই যত রাগ ঐ সাদা ক্রীমের বোতলের উপর গিয়ে পড়তো। বাবা কিছুই টের পেতোনা, কারণ বাবা তখন মেয়েকে ‘ইন্দিরা গান্ধী’ বানানোর কাজে ব্যস্ত। মাথায় ক্রীম ঘষতো আর বলতো,

” আমার মাইয়াটারে আমি ইন্দিরা গান্ধী বানামু, ‘অ্যান আয়রণ লেডী’। চুল আর বড় করা যাবে না, এমন ‘বব কাট’ থাকব’। ইন্দিরা গান্ধী হইল একজন পাওয়ারফুল লেডী, কেমন কইরা এত বড় একটা দ্যাশ চালাইতেছে”।

বাবা বলে যেতো, আমি কিছু না বুঝে ঘাড় ব্যথা সহ্য করে বাবার ‘ইন্দিরা তৈরী প্রকল্পে’ সহযোগীতা করতাম। আমাকে নিয়ে আমার বাবার এই আদিখ্যেতা সম্পর্কে সকলেই অবহিত ছিল, বিশেষ করে আমার মেজদা, যাকে মানসিক শাস্তি দেয়ার জন্য বাবা কাছে ডেকে বসাতো আর বলতো, ” এই যে দ্যাখ, আমার মাইয়ারে কত যত্ন করি, ওরে ইন্দিরা গান্ধী বানামু, তুই সব সময় বান্দরামী করিস, তোরে কিছু দিমুনা”।

এইজন্য আমার নামই হয়ে গেছিল, “বাবার আহ্লাদী মাইয়া”, “ইন্দিরা গান্ধী’।

বাবা সন্ধ্যার সময় নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে পার্ট টাইম চাকুরী করতেন। মাঝে মাঝেই আমার সেজোমামা আমাকে নিয়ে বাবার সাথে দেখা করিয়ে আনতো। ছোটবেলা থেকেই আমি খুব ফিটফাট করে সেজে থাকতাম। আমাকে দেখামাত্র বাবার কলিগরা বলতেন, ” এই যে বাপের আদরের মাইয়া আসছে”। বাবা বলতো, ” হ, আমি ত সব সময় কই, মাইয়াটারে ইন্দিরা গান্ধী বানামু। দেখছেন ওর মাথার চুল, একেবারে ইন্দিরা গান্ধীর মত”।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত জানতাম ‘ইন্দিরা গান্ধী’ মানে মাথা ভর্তি কোঁকড়া চুল, ‘বব কাট’ ছাঁটা চুলের একজন মহিলা, যার চুলের স্টাইল আমার বাবার খুব পছন্দ।

১৯৭১ সালে আমার দেহের বয়স ছিল সাড়ে ছয় বছর, কিন্তু ‘মুক্তিযুদ্ধ’ আমাদের মনের বয়স এক টানে ষোল করে দিয়েছিল। তাই শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে ‘বব কাট’ চুলে নয়, সকলের মুখে মুখে ইন্দিরা গান্ধীর নাম শুনে শুনে উনাকে দেখতে পেয়েছিলাম অন্য এক রূপে, যে রূপ এক ষোড়শীর মনে কাঁপন তোলে, ভালোবাসার দোল দেয়, বন্ধুর সহমর্মিতা, তারুণ্যের সাহস জোগায়।

শ্রীমতি ইন্ধিরা গান্ধী ছিলেন একটি ‘সাহসী, অকুতোভয়, সুবন্ধু’র আইকন, একটি ঝলমলে ‘ইতিহাস।

সেদিন গুলিস্তানের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আমার বুকটার মধ্যে দিড়িম দিড়িম করে কে যেন হাতুরীপেটা করছিল।

ততদিনে বাবার ‘ইন্দিরা তৈরী প্রকল্পের’ সলিল সমাধি হয়েছে, ইন্দিরা গান্ধী হবো কি করে, বাপের দৃষ্টি ফাঁকী দিয়ে, ল্যাব ফাঁকী দিয়ে চুরী করে সিনেমা দেখতে এসেছি।

মাথায় ইন্দিরা গান্ধীর মত চুল থাকলেই কি আর ইন্দিরা গান্ধী হওয়া যায়? একজন ইন্দিরা একবারই জন্ম গ্রহণ করে, একজন মুজিব একবারই জন্মগ্রহণ করে।

মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়া যখন গলা ফাটিয়ে বক্তৃতা করতেন, মুজিবভক্ত বাবা বলতেন, ” মাইকে গলা ফাটিয়ে চীৎকার করে বক্তৃতা করলেই ‘মুজিব’ হওয়া যায়না”,

বাবার কথার সাথে তাল রেখে আমিও মনে মনে বলতাম, ” ‘ববকাট’ চুলে নিয়মিত শ্যাম্পু আর ক্রীম মাখলেই ‘ইন্দিরা ‘ হওয়া যায়না”।

বাবার চোখে বঙ্গবন্ধু আর ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন বিরাট আদর্শ, একটি মুদ্রার এ-পিঠ, ও-পিঠ। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর বাবা এমন শকড হয়েছিলেন! তবুও সান্ত্বনা ছিল, ইন্দিরা গান্ধী বেঁচে আছেন। ১৯৭৭ সালে যখন ইন্দিরা গান্ধী নির্বাচনে পরাজিত হলেন, আশার শেষ প্রদীপও নিভে গেল। রাগে-হতাশায় মোরারজী দেশাইকে নিয়ে বাবা কত যে বিদ্রুপ করতেন! আর বিদ্রুপ করতেন যখনই জিয়াউর রহমান সাহেব ‘মুজিব স্টাইলে ‘ গলা ফাটিয়ে বক্তৃতা দেয়ার চেষ্টা করতেন, হো মো এরশাদ একই চেষ্টা করতেন, বাবা বলতেন, ” গলা ফাটাইলেই কি আর ‘মুজিবর’ হওন যাইব? বিশ্বাসঘাতকের দল সব”।

বাবার হৃদয়ে তখনও ১৫ই আগস্টের জন্য রক্তক্ষরণ হয়, এর সাথে যোগ হলো , ৩১শে অক্টোবার। ‘মুজিবর’ ছিলনা, তবুও তো ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন, তাঁকেও হত্যা করা হলো? গুলিস্তানের ফুটপাথ ধরে দৌড়াচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম, বাবার চেহারা দেখতে কেমন হয়েছে কে জানে!

** কিছু কিছু ঘটনা মন থেকে মুছে যায়না, কিছু কিছু মানুষ হৃদয়ে বসত করেন, বঙ্গবন্ধু যেমন বাঙ্গালীর হৃদয়ে বসত করেন, শ্রীমতি প্রিয়দর্শিনী লৌহমানবীও বাঙ্গালীর কোমল হৃদয়ে বসত করেন।

** শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর প্রয়ান দিবসে ‘ইন্দিরা কাট চুলের কাল্পনিক ইন্দিরা গান্ধীর পক্ষ হতে একরাশ ভালোবাসা এবং বিনম্র শ্রদ্ধা! ৩১/১০/২০১৫

আরো পড়ুন: মুনার অচেনা শহর | পঞ্চম পর্ব