ইলিশের কাঁটা

কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার বলেছেন-

“কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে

দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহীতে?”

আমরা বাঙালীরা সকলেই জানি ইলিশের অনেক কাঁটা, কিন্তু এই কাঁটা বেছে খেতে পারলে ইলিশের স্বাদ একেবারে অমৃত। আসলে ষোলো আনা বাঙালীয়ানাটা ঠিক যেন পূর্ণতা পায় না ইলিশ মাছ ভক্ষন করা ছাড়া। সেজন্য এটা বলা বাহুল্য নয় যে, ইলিশ আর বাঙালী মিলে মিশে একাকার। কত পদের যে রেসিপি আছে এই ইলিশ নিয়ে!

ছোটবেলাতে এই মাছটা খেতে খুবই সমস্যা হতো, মাঝে সাঝে গলায় যে কাঁটা বাঁধেনি সেকথা বলা যাবে না। ইলিশ মাছে কাঁটা যে সকল জায়গাতে বেশী থাকে সেগুলো হলো গাদার অংশে, মাথার কাছাকাছি অংশে, লেজের অংশের কাছে এবং লেজে। বিশেষ করে লেজে প্রচুর পরিমাণে কাঁটা থাকে এবং ওগুলো বেশ বড় ও শক্তও হয়ে থাকে। তবে মায়ের আহ্লাদের কারণে এই অংশের মাছের টুকরোগুলো ছোটবেলাতে আমার খাওয়া হয়নি। তখন মনেই হতো ইলিশের পেটির উপর আমার হয়তো জন্মগত অধিকার। ভাবিইনি এই মাছটির মাথা, লেজ বা লেজের অংশের মাছের টুকরোগুলো কোথায় যায়? তবে মাঝে মাঝে মাছের মাথা দিয়ে পুঁইশাক বা কচুশাক খেতাম, সেজন্য মাথার ব্যবহারিক দিক সম্বন্ধে মোটামোটি একটা ধারণা পেতাম। তবে সত্যি বলতে কি, লেজের খবর আমি রাখার চেষ্টা করিনি।

আজ যখন আমাদের একটা সন্তান আছে, স্বাভাবিকভাবে তাকে পেটির মাছ খাওয়ানোরই চেষ্টা করি, যেহেতু আমি বা সন্তানের মা উভয়েই ছোটবেলাতে পেটির মাছ খেয়ে বড় হয়েছি। তাহলে আমাদের এই নিউক্লিয়াস ফ্যামিলিতে লেজ মাথার কি ব্যবস্থা হচ্ছে? দেখি যে, ওগুলো সন্তানের মায়ে খাচ্ছে। সন্তানের জন্য এই ত্যাগ স্বীকার মা কেনো একা করবে? সন্তান তো আমারও। তো আমরা বাবা-মা দুজনেই মিলে মিশে লেজ-মাথা খাওয়া শুরু করলাম। এখন দেখি লেজ-মাথার স্বাদও খারাপ লাগে না। নাকি অভ্যাস হয়ে গেছে? আচ্ছা আমাদের মায়েরও কি লেজে-মাথার স্বাদ এরকম ভালো লাগতো? জিজ্ঞেস করা হয়নি কখনও। মা এখন মাছ মাংস খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। এখনতো চাইলেও মা’কে পেটির মাছ খাওয়াতে পারছি না। তখন একটিবারের জন্যও তো খবর নেয়নি মা কি খাচ্ছে? ইদানিং ভীষন অপরাধ বোধ হয়। এই লেখাটি সেই কারণেই। আর তাই ইলিশের এই কাঁটাটি গলায় বিধেই থাকলো, হয়তো থাকবে আজীবন । মা, ভালোবাসা আসলেই নিম্নগামী।

স্বপন ধর

আরো পড়ুন: শেষ বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম