ডেঙ্গু মোকাবেলার সহজ উপায়

হাসপাতালে ঠাঁই নেই ঠাঁই নেই অবস্থা। ঘরে ঘরে ডেঙ্গুজ্বর। গত ২০ বছরের রেকর্ড ভেঙ্গে এবার ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ অনেক বেশি। যার ফলে আমাদের মনে এই নিয়ে চরম ভীতি কাজ করছে। সঠিক চিকিৎসার অভাবে ডেঙ্গুজ্বরে মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে। একটু সচেতন আর সাবধানতা অবলম্বন করলেই আমরা এ জ্বর থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে পারি।

ডেঙ্গুজ্বর কিভাবে ছড়ায়

ডেঙ্গুজ্বরের উৎপত্তি ডেঙ্গু ভাইরাস বাহিত এডিস ইজিপ্টাই (aedes aegypti) নামক মশার কামড়ে। ডেঙ্গুজ্বরের জীবাণুবাহী মশা কাউকে কামড়ালে সেই ব্যক্তি ৪ থেকে ৬ দিনের মধ্যে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হতে পারে। আবার এই আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোন জীবাণুবিহীন মশা কামড়ালে সেই মশা ডেঙ্গুজ্বরের জীবাণুবাহী মশায় পরিণত হয়। এভাবে একজন থেকে অন্য জনে মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়িয়ে থাকে। এডিস মশা আবার ৪ ধরনের হয়। যাকে সেরোটাইপ (serotype) বলা হয়। তবে কোন সেরোটাইপে আক্রান্ত হলো আর কোন সেরোটাইপের জটিলতা কেমন তা নিয়ে গবেষণা না থাকায় চিকিৎসকদের কাছে এখনও আলাদা কোন নির্দেশনা নেই।

লক্ষণ বা উপসর্গ

তাপমাত্রা : ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে জ্বরের তাপমাত্রা হয় অনেক বেশি। গড়াতে পারে ১০৪ ডিগ্রী ফারেনহাইট পর্যন্ত।

লাল লাল ছোপ

রোগীর সারা গায়ে ঘামাচিরমতো লাল লাল ছোপ উঠতে পারে। সাধারণত বুকের দিকে বেশি দেখা যায়। এই ছোপ এ চাপ দিলে ওই জায়গাটা সাদা হয়ে যাবে আবার কিছুক্ষণ পর লাল ছোপটা ফেরত চলে আসবে।

মাড়িতে রক্তক্ষরণ

ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হলে দাঁতের মাড়ি থেকে রক্ত পরতে পারে।

মলের রং পরিবর্তন

ডেঙ্গুজ্বর হলে মলের রং পরিবর্তন হতে পারে অর্থাৎ পায়খানা কালো হতে পারে।

অনুচক্রিকার সংখ্যা

জ্বরের তীব্র পর্যায়ে ধমনী ছিদ্র হয়ে যেতে পারে এবং রক্তে অনুচক্রিকার সংখ্যা কমে যেতে পারে। ডেঙ্গুর এ তীব্র মাত্রাকে ডাক্তারি ভাষায় ‘ডেঙ্গু হেমোরেজিক (dengue hemorrhagic)’ বা ‘ডেঙ্গু শক সিনড্রোম (dengue shock syndrome)’ বলা হয়। ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের উপসর্গ হলো- শ্বাস-প্রশ্বাসে অসুবিধা হওয়া কিংবা শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বেড়ে যাওয়া, অবিরাম অস্বস্তি এবং অবসাদ। অনেক ক্ষেত্রে কিডনি (kidney) বিকল হয়ে যাওয়ারও আশঙ্কা থাকে। এছাড়াও বিরামহীন মাথা ব্যথা, বমি ভাব ও বমি হওয়া, হাড় ও হাড়ের জোড়ায় ব্যথা, পেশিতে ব্যথা, গ্রন্থি ফুলে যাওয়া, চোখের পেছনে ব্যথা হওয়া ইত্যাদি হতে পারে।

ডেঙ্গুজ্বর হলে চিকিৎসা কেমন হবে?

ভাইরাল জ্বরের মতোই ডেঙ্গুজ্বরের চিকিৎসা। ভাইরাল জ্বর হলে আমরা প্যারাসিটামল খাই। তেমনি ডেঙ্গুজ্বর হলেও প্যারাসিটামল খেতে হয়। তবে ডেঙ্গুজ্বর হলে তরল খাবার যেমন লেবুর শরবত, স্যালাইন, টেস্টি স্যালাইন পরিমাণে বেশি খেতে হবে। এই জ্বরে পানিশূন্যতা বেশি দেখা দেয়, প্রশ্রাবের পরিমাণও কমে যেতে পারে। তাই বেশি করে পানি পান করতে হবে।

কখন হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে?

ডেঙ্গুজ্বর হলেই যে হাসপাতালে ভর্তি হতেই হবে তেমন নয়। প্লাটিলেট কাউন্ট যখন ৩০ হাজারের নিচে নামে তখন আপনি হাসপাতালে ভর্তি হতে পারেন। এছাড়াও যদি অনেক বমি শুরু হয় আর দাঁতের মাড়ি দিয়ে রক্ত যায়, কালো পায়খানা হয় এবং রোগী অনেক দুর্বল হয়ে যায়, তখন প্রেশার কমে গেলে দেরি না করে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।

ডেঙ্গুজ্বর প্রতিরোধে করণীয় ও সতর্কতা

ডেঙ্গুজ্বর প্রতিরোধের জন্য ‘ডেংভ্যাক্সিয়া (Dengvaxia)’ নামক টিকা পাওয়া যায় যা ৯ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের জন্য প্রযোজ্য। ১২ মাসে ৩ ডোজের মাধ্যমে এই টিকা দেয়া হয়। প্রায় ৫০ শতাংশ কার্যকর এই টিকা।

মশার ক্ষেত্রে সতর্কতা

ডেঙ্গু ভাইরাসবাহী মশা দিনের বেলা সক্রিয় থাকে বেশি। তাই দিনের বেলা মশা যাতে না কামড়ায় সেদিকে ব্যবস্থা নিতে হবে। যদিও সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে এই মশা রাতেও কামড়ায়। তাই মশার কয়েল, মশারি, এ্যারোসল ইত্যাদি নিয়মিত ব্যবহার করার চেষ্টা করতে হবে।

বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে

ডেঙ্গু মশা পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে। খেয়াল রাখতে হবে কোন খোলা পাত্রে, ফুলের টবে, টায়ার, এয়ারকুলারে যেন পানি জমে না থাকে। সুতরাং বাড়ির আশপাশ বেশ ভাল করে পরিষ্কার করতে হবে।

পেইন কিলার

কোন প্রকার পেইন কিলার দেয়া যাবে না। রোগীকে ভুলেও এ্যাসপিরিন (aspirin) দেয়া যাবে না।

ভুল ধারণা

ডেঙ্গুজ্বর নিয়ে আরেকটি কথা না বললেই নয় যে, অনেকেই ভাবে ডেঙ্গু একবার হলে বোধহয় আর হয় না। এটা সম্পূর্ণ ভুল চিন্তা! ডেঙ্গু একবার হলে যে আরেকবার হবে না, এর কোন নিশ্চয়তা নেই। বরং দ্বিতীয়বার হলে এর মাত্রা আরও বেশি হয়।

চিকিৎসকদের মতে, যে টাইপের এডিস মশার কারণে একবার ডেঙ্গু হয়, সেই একই টাইপের ভাইরাস থেকে একই ব্যক্তি দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হবে না। এডিস মশার বাকি তিন টাইপের ভাইরাস থেকেও ব্যক্তি আবারও আক্রান্ত হতে পারে।

পরিশেষে এতটুকুই বলা যায়, আমাদের সতর্কতা আর সচেতনতাই হতে পারে ডেঙ্গু থেকে দূরে থাকার প্রধান উপায়।