সোনার কাঠি রূপার কাঠি | শারমিনের ডিফারেন্ট লুক

শারমিন জাহান একটি বিদেশী দাতা সংস্থার পদস্থ কর্মকর্তা। এটাই তাঁর পরিচয় হিসেবে যথেষ্ট হতে পারত, কিন্তু তিনি সম্ভবত অন্য ধাতুতে গড়া। তাই নতুন কিছু করা বা সাফল্যের জন্য চ্যালেঞ্জ গ্রহন করা তার সহজাত মানসিক প্রবৃত্তি। তিনি বাংলাদেশে অনলাইনে পণ্য বেচাকেনা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান “ডিফারেন্ট লুক” এর উদ্দ্যোক্তা। অনলাইন ব্যবসা শিল্পের একজন পথিকৃতও তিনি। ২০১১ সালে অনেকটা শখের বসে শুরু করেছিলেন “ডিফারেন্ট লুক”। আজ প্রায় এক দশক পরে অনলাইনের পাশাপাশি চালু করেছেন ফিজিক্যাল আউটলেট। বিজয় ১৯৭১ এর পাঠকদের তিনি জানিয়েছেন এই দীর্ঘ সময়ের চড়াই উৎড়াইয়ের গল্প। স্বাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইয়াকুব আলী মিঠু।

বিজয়১৯৭১: একটি বিদেশী সংস্থায় চাকুরী করেও আপনার কেন মনে হল যে, পাশাপাশি আরো কিছু করা দরকার?

শারমিন: আমার অফিসে আমি যে কাজটা করি সেটা একেবারেই নিখাদ প্রশাসনিক কাজ। কিন্তু আমি প্রায়ই আমার ভেতরে যে একটা সৃষ্টিশীল সত্বা আছে সেটা টের পেতাম। আমি ছোটবেলা থেকেই সেলাই করতে খুব পছন্দ করতাম, আমার ধারনা সব মেয়েরাই তা করে। এটা ছিল আমার নেশার মত, সময় পেলেই এটা সেটা নিয়ে বসে যেতাম সেলাই করতে। তো ওখান থেকে প্রেরণা নিয়ে মনের ক্ষুধা মেটাতে এই ব্যবসা শুরু করা।

২০১১ সালে যখন ফেসবুক মার্কেটিং একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে তখনই আমি ভাবলাম যে, আমি তো সারাদিন কম্পিউটার নিয়েই থাকি তো দেখি একটু চেষ্টা করে। এছাড়াও একটা বিষয় ছিল সেটা হলো আমি যে প্রজেক্টে কাজ করতাম সেটা ছিল পাঁচ বছরের জন্য। ভাবতাম যদি প্রজেক্ট নবায়ন না হয় বা অন্য কোন প্রজেক্টে যদি জায়গা করে নিতে না পারি তবে তো বিকল্প একটা আয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে। আমি তো চাকরির পাশাপাশি অন্য কোন কাজে ঢুকতে পারবো না, এক্ষেত্রে অনলাইন আমার সামনে একটা সুযোগ করে দিল।

মাঝে মাঝে ভাবি, ব্যবসাপাতি ছেড়ে দেই, এত পরিশ্রম, এত প্রতিযোগীতা.. ছেড়ে দেব সব কিছু.. কিন্তু.. এখন আমি যে প্রজেক্টটায় আছি সেটাও মাত্র দুই বছরের জন্য, এই তো সামনের সেপ্টেম্বরে শেষ হয়ে যাবে; তখন কি করবো! এই অনিশ্চয়তা আমাকে পুরো উদ্যোমে ডিফারেন্ট লুক নিয়ে ভাবতে তাড়িত করে।

বিজয়১৯৭১: ডিফারেন্ট লুকের শুরুটা কেমন ছিল?

শারমিন: আমি ফেসবুকে এক বড় ভাইকে দেখতাম পেইজ চালাতো. তো আমি একদিন ভাইয়াকে বললাম যে আমি অনলাইনে কিছু একটা করতে চাই। আপনার কাছ থেকে খুটিনাটি বিষয়গুলো শিখতে চাই যেমন, পেইজ কিভাবে ম্যানেজ করে, বুষ্ট কিভাবে করে ইত্যাদী। সেটা হচ্ছে একেবারে প্রাথমিক দিক।

আমার ফেসবুকে, চাইনিজ ‍উইচ্যট এবং স্কাইপেতে কিছু ফ্রেন্ড ছিল তারা পরামর্শ দিল যে, তোমাকে আলী এক্সপ্রেসের লিঙ্ক দিচ্ছি ওদের সাথে স্কাইপেতে কথা বলো.. আলী এক্সেপ্রেসের মাধ্যমেই আমার শুরু। আলী এক্সপ্রেসের সাথে আমি নিয়মিত চ্যাট করতাম। এটার দাম কত ওটার দাম কত। আমি তখন জুয়েলারী কিনতাম এক ডলার দুই ডলারে। এরপর ভাবলাম ঝুকি একটা নিয়ে নেই..  তখন আমি সরাসরি চায়না থেকে পণ্য আনলাম। সেটাই শুরু।

ডিফারেন্ট লুক নামটা আমার দেয়া। এটা নিয়েও নিজেদের মধ্যে অনেক আলোচনা করেছি.. অনেকেই বলছিল কেমন নাম… কেমন নাম.. ক্রেতারা কিভাবে নেবে। পরে সবাই একমত হয়ে এই নামটাই নিলাম। অনলাইন শপের পেইজটা তৈরী হয়ে গেলে প্রথম যে পোষ্টটা দিয়েছিলাম আমার মনে আছে পরদিনই সেটা বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। এতে আমার উৎসাহ অনেক অনেক বেড়ে গেল।

বিজয়১৯৭১: প্রথম দিকে ডেলিভারীর বিষয়টা কিভাবে ম্যানেজ করতেন?

শারমিন: প্রথম দিকে এত বেশী পণ্য বিক্রি হতো না। দু’একটা যা বিক্রি হতো সেটা আমরা নিজেরাই বাসায় বাসায় গিয়ে পৌছে দিয়ে আসতাম। পরে যখন বিক্রি বেড়ে গেল তখন খুঁজতে থাকলাম আশেপাশে ডেলিভারী কোম্পানী কারা আছে। আমার বেশী দিন লাগেনি, সপ্তাহ খানিক পরেই আমি ডেলিভারী কোম্পানীর মাধ্যমে পণ্য সরবরাহ শুরু করি। আমার পণ্যের প্রচুর চাহিদা ছিল.. আমার পণ্য কখনও অবিক্রিত থাকতো না।

বিজয়১৯৭১: অনলাইন ব্যবসার সম্ভাবনা কেমন?

শারমিন: অনেকেই বলেন অনলাইনে ব্যবসার সম্ভাবনা অনেক বেশী, আমার তা মনে হয়না। বাংলাদেশে একটা ব্যবসা যখন শুরু হয় তখন এর জোয়ার শুরু হয়ে যায়। এই যেমন শেয়ার ব্যবসা, ডিসের লাইনের ব্যবসা। এক সময় হয়তো দশটা শপ ছিল.. দেখা যাচ্ছে যে এখন শপের সংখ্যা দশ হাজার। আগে পিছে না ভেবেই সবাই এই ব্যবসায় ঝাঁপিয়ে পরছে। আমার কাছে এখন মনে হচ্ছে অনলাইন ব্যবসাটা সেরকমই।

চায়নাতে যেমন বড় বড় কোম্পানী ব্যবসা করছে আমাদের দেশে কিন্তু সে রকম শুরু হয়নি। আমাদের দেশে এখন আলীবাবা, আমাজনের মত বড় বড় কোম্পানী ঢুকছে কাজেই প্রতিযোগীতা অনেক অনেক বেড়ে যাচ্ছে। ওরা পণ্যের গুনগত মানের চেয়ে দামের দিকে বেশী গুরুত্ব দিচ্ছে, সেক্ষেত্রে আমরা যারা পণ্যের গুনগত মান বজায় রেখে ব্যবসা করতে চাই তারা প্রতিযোগীতামুলক দামে টিকে থাকতে পারব না। আর গ্রাহকের মানসিকতায়ও অনেক পরিবর্তন এসেছে। তারাও এখন সস্তায় ফেন্সি পণ্য কিনতে চায় যাতে নতুন নতুন গহনা বা জামা পরে সেলফি দিতে পারে। তারা এখন মান নিয়ে ভাবছে না, তারা একটা পণ্য একদিন ব্যবহার করে তুলে রাখল আবার নতুন পণ্য কিনে পরলো কাজেই তারাও সস্তা পণ্যের দিকে ঝুকছে কিন্তু আমাদের এখানে স্থানীয়ভাবে পণ্য তৈরী করা ব্যয় সাপেক্ষ অন্যদিকে আমদানি করা পণ্য বিক্রি করে মুল প্রতিষ্ঠানের (আমাজন, আলীবাবা) সাথে প্রতিযোগীতা করে টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।

আরো পড়ুন: সোনার কাঠি রূপার কাঠি | মাদকমুক্ত নেতৃত্ব মানে মাদকমুক্ত দেশ

বিজয়১৯৭১: কিন্তু এই বৈশ্বিক যুগে আপনি তো দরজা বন্ধ করতে পারবেন না।

শারমিন: না আমি দরজা বন্ধ করা পক্ষেও না। সেক্ষেত্রে আমাদের পণ্যে বৈচিত্র আনতে হবে। পণ্যের ডিজাইন যেন কপি না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। আর অবশ্যই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাটা ভিষন জরুরি। সরকার যদি এমনভাবে কর বিন্যাস করে যেন আমরা যারা এখানে ব্যবসা করছি তারা মূল্য প্রতিযোগীতায় টিকে থাকতে পারি তাহলে ভাল হয়। আর এ ব্যবসায় একটা গ্রহনযোগ্য নীতিমালা এখন সময়ের দাবী।

বিজয়১৯৭১: নতুন যারা এ ব্যবসায় আসতে চায় তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কি?

শারমিন: নতুনরা অবশ্যই অনলাইনে পণ্য কেনাবেচার ব্যবসায় আসতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে তাদের প্রচুর গবেষণা করতে হবে। বাজার চাহিদা, পণ্যের যোগান ইত্যাদী বিষয়গুলো আগে থেকে না ভেবে ব্যবসা শুরু করলে লাভবান হওয়া কঠিন হবে। আমি বলবো, গতানুগতিক সবাই যা করছে তা না করে যদি নতুন কোন সেবা বা নতুন কোন পণ্য নিয়ে ব্যবসা শুরু করে তাহলে সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশী।

বিজয়১৯৭১: আগামী পাঁচ বছরে ডিফারেন্ট লুক কে কোন পর্যায়ে দেখতে চান।

শারমিন: আমি প্রতিনিয়ত পণ্য নিয়ে গবেষণা করি। একসময় আমি ঘড়ি বিক্রি করতাম। অনেক চাহিদা ছিল তখন, পরে দেখি আরো অনেকেই এটা শুরু করে দিল। তখন আমি জুয়েলারী বিক্রি শুরু করি এবং সফল হই। এখন নতুন কোন পণ্য নিয়ে ক্রেতার সামনে হাজির হওয়া যায় সেটা নিয়ে গবেষণায় প্রচুর সময় ব্যয় করছি। খুব তাড়াতাড়ি আমাদের ক্রেতারা আরো নতুন নতুন বৈচিত্রপূর্ণ পণ্যের সমাবেশ দেখতে পারবেন।

সম্প্রতি আমরা শ্যামলী স্কয়ারে একটা আউটলেট করেছি এতে করে ক্রেতাদের মধ্যে আস্থার একটা জায়গা তৈরী হয়েছে। খুব শিঘ্রই বনানীসহ আরো কয়েকটা আউটলেট চালু করার পরিকল্পনা আছে। যাতে করে ক্রেতারা অনলাইনে পণ্য দেখে আউটলেটে এসে পণ্যের গুনাগুন বিচার করে পণ্য কিনতে পারে। আর তাছাড়া ক্রেতা যদি পণ্য ফেরত দিতে চায় বা পণ্যের গ্যারান্টি থাকে তবে তারা কোথায় আসবে? তাই অনেকগুলো আউটলেট করতে চাই।

বিজয়১৯৭১: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

শারমিন: আপনাকেও ধন্যবাদ।