সংকটের এ বিহ্বলতা নিজেরই অপমান

“যত গর্জে তত বর্ষেনা” এই প্রবাদের সাথে আমরা কম বেশী অনেকেই পরিচিত কিন্তু তীব্র গর্জনের পরে আপনাকে ভেজানো দুরের কথা বৃষ্টির কণাটুকুও অনুভব করতে না পারলে একে আপনি কি বলবেন? ঢাক ঢোল পিটিয়ে  শেষ হয়ে গেল ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ দিন ব্যাপী  ৩৩ তম ফোবানা কনভেনশন  যার একটি  নাসাও কলিসিয়াম এবং অন্যটি লাগোর্ডিয়া মেরিওট হোটেলে ।

ফোবানা সম্মেলন মুলত প্রবাসীদের মিলনমেলা হিসেবে পরিচিত কিন্তু সেই মিলন মেলা মিলনের না হয়ে এবার  বিভাজন এঁকে নিজেদের নির্লজ্জ উপস্থিতি প্রকাশ করলো। এর কারন হিসেবে অনেকেই বলেন এবং মনে করেন নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব । আহারে নেতৃত্ব! গত ২ বছরে নিউইয়র্কবাসী হয়ে একটা জিনিসেই খাঁটি বাঙালীয়ানা খুঁজে পাই আর তা হচ্ছে দলাদলি- কোন্দল ! সেই সাথে নেতৃত্বের দখল নিয়ে মামলা । রাজনৈতিক দল বা সাহিত্য সংস্কৃতির আসর কিম্বা কমিউনিটির কোন সংগঠন এমনকি জেলা বা উপজেলা সমিতির বেশির ভাগই একতার বদলে বিভক্তির চরম নগ্ন প্রকাশ দৃশ্যমান। 

নিউইয়র্ক শহরে এখন ঠিক কত বাঙ্গালী আছে তা সঠিক ভাবে না জানলেও এটা বোঝা কষ্ট নয় যে,এ শহরে বাঙালীর উপস্থিতি একেবারে কম নয়। আপনি যদি ভুল করে কখনও সন্ধ্যা বা শেষ বিকেলে ১৬৮ স্টীট হিলসাইড, ৭৪ জ্যাকসনহাইটস ডাইভারসিটি প্লাজা এবং এর আশে পাশে, স্টারলিং এভিনিউ ব্রোনক্স অথবা চার্চ এভিনিউ ম্যাকডোনাল্ড ব্রুক্লীনে আসেন তাহলে আপনার মনে হতেই পারে আপনি  আমেরিকা নয় বরং ঢাকা শহরের  শাহবাগ, কারওয়ান বাজার বা ফার্মগেটের কোন এক জায়গায় এসে পড়েছেন। চারপাশের রেস্টুরেন্ট, দোকান, সুপারশপগুলোতে বাংলা সাইনবোর্ড, আর বাংলা ভাষাভাষী মানুষের ভিড়। এরা রাস্তায় দাড়িয়ে চা সিগারেট খাচ্ছে আর বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে তর্ক, গপ্প করে চলেছে।

এদের বেশিরভাগই মধ্য বয়সী । ডিভি ভিসা, পারিবারিক ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা, ভিজিট ভিসা এমনকি সিমান্ত পাড়ি দিয়েও অনেকে এদেশে এসে বসতি গড়েছেন। এদের মধ্যে কাগজপত্রবিহীন মানুষের সংখ্যাও একেবারে কম নয়। বছরের পর বছর এইসব কাগজপত্রবিহীন মানুষ দেশ থেকে পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন। একটু সাচ্ছন্দের আশায়  এরা পড়ে আছেন এই প্রবাসে কিন্তু এদের বুকের মাঝে বাংলাদেশ । অন্তরের অন্তস্থল থেকে এরা বাংলাদেশের আবহাওয়া, নদী  প্রকৃতি আর আপনজনকে ধারণ  করেন এবং এরা সবাই শ্রমিক শ্রেণী। দিন রাত কঠোর শ্রম দিচ্ছেন একটা ডলার পাবার আশায় সেই সাথে আড্ডা বা আনন্দের খোরাক জুগিয়ে নিচ্ছেন দেশী স্টাইলে। এদের এইসব সহজ সরল বাঙ্গালী বাসনাকে পুজি করে একদল মানুষ দিনের পর দিন প্রতারণা আর ঠকবাজীর ব্যবসা করে যাচ্ছেন অবলীলায়। কখনও সমিতির নামে, কখনও এসোসিয়েশনের নামে কখনও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নামে।

প্রতিটা সমিতি বা এসোসিয়েশন এর কার্যক্রম চোখে পড়ে বছরে একবার পিকনিক বা নেতা নির্বাচনের সময়। সমিতি বা এসোসিয়েশন গুলো প্রচারনার পিছনে বিশাল অঙ্কের টাকা খরচ করে নির্বাচনের সময় নিজেদের প্রার্থিতা নিশ্চিত করতে এবং ভোটে জয়লাভ করতে। গত ২ বছরের বেশী সময় বাংলাদেশ এসোসিয়েশনের নির্বাচনে প্রার্থীতা ঘোষনা হবার পরেও মামলার কারনে শেষ মুহুর্তে নির্বাচন হয়নি কিন্তু প্রচারনার কমতি ছিলনা। এইসব এসোসিয়েশন মুলত কমিউনিটিতে কি ভুমিকা রাখছে সেটা বোধকরি কেউ জানেনা।

অথচ এই মুহুর্তে আমেরিকার অভিবাসীরা সবচেয়ে দুঃসময় পার করছেন। ট্রাম্প এডমিনিস্ট্রাশন প্রকাশ্যে বেপোরোয়াভাবে কালো এবং বাদামী অভিবাসীদের ঝেটিয়ে বিদায় করতে উঠে পড়ে লেগেছে। আইসের ধরপাকড়ের হাত থেকে কাগজপত্রওয়ালা বা কাগজপত্রবিহীন কেউই রেহাই পাচ্ছেনা। সামান্য ছুতোয় বহিস্কার হয়ে যাচ্ছে কত শত মানুষ।

এর উপরে এসেছে পাবলিক চার্জের খড়্গ! অভিবাসীদের বেশিরভাগ মানুষ সরকারী সবাস্থ্যসেবার উপরে নির্ভরশীল, কেউ  ফুড স্টযাম্প এবং সরকারী বাসা নিয়ে আছেন। নতুন আইনে এদের অনেকেই এই সেবা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। এই সেবা গ্রহণকারীদের অনেকেরই পরিবার পরিজনের অভিবাসী হবার পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে । এছাড়াও চলমান আবেদনে অনুমোদন বা অভিবাসী কাগজ পাবার ক্ষেত্রে  জটিলতা দেখা দিতে পারে, ফলে তারা ঝুঁকি নিয়েও এইসব সেবা থেকে সরে আসছেন। এই দেশে সাধারন কায়িক শ্রম করে চিকিৎসা ব্যায় মেটানো বা ওষুধের ব্যায় মেটানো দুঃসাধ্য ।

এরকম হাজারো জাতীয় সমস্যার পাশাপাশি আছে সামাজীক সমস্যা, কিন্তু কখনই কোন এসোসিয়েশন বা সমিতিকে এসব সমস্যা নিয়ে কাজ করতে দেখা যায়না। এমনকি নতুন যারা অভিবাসী হয়ে আসে তাদের কর্মসংস্থান বা অভিবাসন ক্ষেত্রেও নেই কোন নির্দেশিকা মুলক কার্যক্রম।

এই যে এত বাঙ্গালী নিউইয়র্কে বা পুরো আমেরিকায় কিন্তু সাবওয়ে বা কোন সরকারী প্রতিষ্ঠানে বাংলায় নির্দেশনা নাই। তবে আপনি চাইলে দোভাষীর সাহায্য নিতে পারেন সিটি বা রাষ্ট্রীয় কাজে। দুই একটা অফিসিয়াল কাগজ বাংলায় পাওয়া যায় কিন্তু তার ভাষা দেখে আপনি ভিমড়ী খাবেন । এসব নিয়ে কোন উচ্চবাচ্চ্য নেই।

এত বড় জনগোষ্ঠীর একটা শহরে নেই কোন বাংলা সংস্ক্তি কেন্দ্র। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা সঙ্গীত আয়োজনের নামে যা হয় তা নিয়ে কথা বলতে গেলে আসলে ভাষা খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

প্রায় প্রতিটা দেশের জাতীয় দিবসে বড় বড় রাস্তায় কি অসাধারন শোভাযাত্রা দেখা যায় কিন্তু আমাদের জাতীয় দিবসগূলোতে সেই ভাগাভাগি; যে যার মত অনুষ্ঠান করে, কেউ কারটায় যায়  না, দেখেও না। 

 কিন্তু এদের মাঝে এদের সন্তানদের এসবে তেমন দেখা যায়না। কোন কমিউনিটি অনুষ্ঠানেও এই প্রজন্ম (যারা নিউইয়র্কে জন্ম বা বেড়ে উঠেছে) তাদের কেউ তেমন ভাবে অংশ নেয়না বা নিতে চায়না। দুই একটা ব্যাতিক্রম যেমন বাফা বা বিপার মত সংগঠন গুলো পরবর্তি প্রজন্মের বাঙ্গালী আমেরিকান ছেলে মেয়েদের বাঙ্গালী সংস্কৃতি চর্চার একটা অসাধারন দৃষ্টান্ত। মুক্তধারা আয়োজিত বইমেলার একটা আকর্ষনীয় ঐতিহ্যগত সুনাম থাকলেও সেটাও প্রশ্নের বাইরে নয়। 

হ্যাঁ নতুন প্রজন্ম আমেরিকান বাঙ্গালী এই যে বিশাল একটা সম্ভাবনা যারা পড়াশোনা সহ অনেক ক্ষেত্রেই এগিয়ে চলেছে কিন্তু এদের শিকড় তেমন ভাবে বাঙ্গালী বা বাংলাদেশ কেন্দ্রীক নয়। এরা তাদের পুর্বসুরীদের কাজ কর্মে বড়ই বীতশ্রদ্ধ।

এবারের ফোবানা কনভেনশনের স্লোগান ছিল “আমার সন্তান আমার অহঙ্কার”। অবশ্যই আমাদের সন্তান আমাদের অহঙ্কার আর আমাদের সন্তানদের অহঙ্কারের ভিত্তি তাদের পুর্বসুরী ও বাঙালী ঐতিয্য। আমরা কি আদৌ এমন কিছু করতে পারছি যা তাদেরকে অহংকার এনে দেয় , গর্বিত করে একজন বাঙ্গালী -আমেরিকান বা একজন বাঙ্গালীর উত্তরাধিকার হিসেবে?

গত শুক্রবার ৩০ আগস্ট থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত দুই দুইটা ফোবানা সম্মেলনে ঠিক কত টাকার শ্রাদ্ধ হয়েছে তা মনে করতেই আমার ভিমরী খাবার জোগাড়। অনেকে বলবেন, আমি আদার বেপারী জাহাজের খবরে আমার কি দরকার? হ্যাঁ ভাই, আমি আদার ব্যাপারী; এই শহরে, এই দেশে হাজারো শ্রমিক খেটে খাওয়া মানুষ যাদের এক একটা ডলার রক্ত ঘামের বিনিময়ে অর্জন, তারা আপনাদের এই নেতাগিরী আর শো আপ টিকিয়ে রাখার কুট-কৌশলের জালে বন্দী হয়ে আছে।

সারা সপ্তাহ বা বছর এরা পরিশ্রম করে , এদের বিনোদন দেবার নাম করে সেই রক্ত ঘামের ডলার আপনি  এবং আপনারা যা ইচ্ছা তাই করে যাবেন দিনের পর দিন সেটা কি চলতে দেয়া যায়? আমি জানি নিজেরা নিজেরা চায়ের আড্ডায় অনেকেই এসব নিয়ে কথা বলেন কিন্তু প্রকাশ্যে কেউ সাহস পাননা বা বলতে চাননা কারন এদের অনেকেরই অনেক সামর্থ আছে। আমার এরকম কিছু নেই তাই আমি সবিনয়ে জিজ্ঞেস করতে চাই , নাসাও কন্সোর্টিয়াম পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভেনু সে বিষয়ে কারো দ্বিমত  নেই কিন্তু ১৫০০০ লোকের ধারন ক্ষমতায় মাত্র ২০০০ লোক জমায়েত করতে পারেননি, সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নুন্যতম টিকিট মুল্য ছিল ৩০ ডলার আর সেই টিকিট কেটে দর্শকদের আপনারা যা দেখিয়েছেন তা আসলে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে কতটা প্রতিনিধিত্ব করে বা আমাদের অহঙ্কার কতটা উচ্চ হয়? অথবা  স্টল মালিকগন যখন ক্ষুদ্ধ হয়ে আয়োজকদের মারতে উদ্যত হয় এবং নাসাও কর্মচারীদের মধ্যস্ততায় তা মিমাংসা হয়  তখন আসলে আমরা কতটা সম্মানিত হই? 

রওশন আরা নীপা

চলচ্চিত্র নির্মাতা

আরো পড়ুন: মুনার অচেনা শহর | প্রথম পর্ব