পরবাসী মন : প্রজন্মের জন্য কী রেখে যাচ্ছি!

রিতা রায় মিঠু: ফেসবুকে পাওয়া এক বোন, নামের শেষে জাহান রেখে প্রথম নাম পাল্টে নাম দিলাম ‘অনামিকা জাহান’। অনামিকা আমাকে অনেক আগে থেকেই বুবু ডাকে। প্রধানমন্ত্রীকে আমি ডাকি বুবু, অনামিকা আমাকে ডাকে বুবু। আমি শেখ হাসিনাকে ভালোবাসি, অনামিকা শেখ হাসিনাকে আমার চেয়েও অনেক বেশি ভালোবাসে।

অনামিকা স্বাধীনচেতা মেয়ে, চাকরি করে। শাড়ি ওর প্রিয় পোশাক, আধুনিক মন মানসিকতা সম্পন্ন এবং ধার্মিক। ওর ধর্মিয় বোধ আর আমার ধর্মিয় বোধ হুবহু একরকম, শুধু ধর্মীয় আচার ভিন্ন। অনামিকার স্বভাবের সাথে আমার স্বভাবে মিল আছে তাই আমি ওকে একটু অতিরিক্ত ভালোবাসি।

অনামিকা স্বামী সন্তান নিয়ে ঢাকায় থাকে, বাবার বাড়ি জকিগঞ্জ। মাসে একবার জকিগঞ্জ যায়। গত সপ্তাহে জকিগঞ্জ থেকে এসি কোচে ঢাকায় ফিরছিল। দেশের বর্তমান ধারা অনুযায়ী এসি বাসে ক্যাসেটে ইসলামী গান বাজানো হচ্ছিল। বাদ্য যন্ত্র ছাড়া খালি গলায় কাওয়ালী ধরণের গান চলছে। অনামিকার খারাপ লাগছিলনা কাওয়ালি শুনতে।

অনেকটা পথ পেরিয়ে আসার পর ড্রাইভার সাহেব কাওয়ালি বন্ধ করে ওয়াজের ক্যাসেট চালিয়ে দিলেন। এবং ভল্যুম বাড়িয়ে দিলেন। অনামিকা একটু নড়ে চড়ে বসলো। কারণ ওয়াজে আধুনিক শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে বলা হচ্ছে। অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নাম উল্লেখ করে গালিগালাজ করা হচ্ছে। নারীদের গালি দেয়া হচ্ছে। ফাঁকে ফাঁকে জান্নাতে যাওয়ার পথ বাতলে দেয়া হচ্ছে।

কিছুক্ষণ পরেই অনামিকার শ্বাস কষ্ট শুরু হলো, ঢাবিতে পড়ার সময় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী তার শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষকের নামে এসব কি বলছে? ফেসবুকেও ইদানিং এই ধরণের ওয়াজের ভিডিও ক্লিপ সে দেখেছে। নারীর বদনাম শুনে সে অভ্যস্ত, জান্নাতে যাওয়ার পথ সম্পর্কে জানতে কোন সমস্যা নেই, কিন্তু আধুনিক শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে যা সব বলা হচ্ছে তা নিয়ে ওর আপত্তি।

সারা বাসে সবাই খুব আনন্দ নিয়েই কবীর চৌধুরীর বদনাম শুনছে মনে হয়। অনামিকা একা, পাশে বর থাকলেও ওয়াজে থেকে মন সরিয়ে বরের সাথে গল্প গুজব করে সময় কাটিয়ে দিতে পারত। ওর বর নিজেও কথা বলতে পছন্দ করে।

আর সহ্য করতে না পেরে অনামিকা ড্রাইভার সাহেবকে ঊদ্দেশ্য করে বলল, ” ড্রাইভার সাহেব, এতক্ষণ কাওয়ালি চলছিল, সেটাইতো ভাল ছিল। এই ওয়াজ ছাড়ছেন কেন?”

ড্রাইভার সাহেব তিড়িং করে বলল, ” আফনের কি সমস্যা ওয়াজে? ওয়াজ তো বালা।”

অনামিকা বলল, ” ঠিক আছে, ওয়াজ চলুক, কিন্তু সাউন্ড একটু কমিয়ে দিন, এই আওয়াজে আমার মাথা ব্যথা করছে। এতটা পথ যেতে হবে ওয়াজ শুনতে শুনতে?”

এবার মাঝ বয়সী এক পুরুষ যাত্রী লাফিয়ে উঠলো, অনামিকাকে বলল, ” ওয়াজ ভাল্লাগেনা আপনের? কি ভাল লাগে? বেডিগোরে পর্দা মানতে কয়, তা ভাল্লাগে না! বেপর্দা হইয়া চলতে ভাল লাগে?

ওয়াজ চলব, আপনার ভাল না লাগলে এই বাস থিকা নাইমা যান। অই ড্রাইভার, সাউন্ড বাড়ায়ে দেন। এই যে সুপার ভাইজার, এই মহিলারে বাস থিকা নামায়ে দেন, তার সিটের ভাড়া আমি দিয়া দিমু”।

সারা বাসের সবাই নিশ্চুপ, একজন ভদ্রমহিলাকে মধ্যবয়সী এক পুরুষ বাস থেকে নামিয়ে দিতে চাইছে, সুপারভাইজারকে বলছে মাঝপথে ভদ্রমহিলাকে নামিয়ে দিতে, বাসের অন্য কোন যাত্রী এর প্রতিবাদ করছেনা। ড্রাইভার সাহেব ওয়াজের সাউন্ড আরও বাড়িয়ে দিল। সুপারভাইজার সেই মাঝবয়সি যাত্রীর দিকে তাকিয়ে হাসছিল।

অনামিকার পরনে ছিল টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়ি, মাথায় আঁচল দিয়ে ঘোমটা টানা। তবুও অনামিকাকে আধবুড়ো খাটাশটা বেপর্দা বলল! লজ্জায় অনামিকার মুখ লাল হয়ে গেলো!

ধার্মিক যাত্রীর ধর্মপরায়নতার কঠিন রূপ দেখে অনামিকা এবার ভয় পেয়ে গেলো। অনামিকার সাথে যে অভদ্র আচরণ করছে একজন যাত্রী আর ড্রাইভার মিলে, বাকী সবাই চুপ মানেই তারাও এই যাত্রীকেই সমর্থন করছে।

ওয়াজে তখনও নারীকে গালিগালাজ করা হচ্ছে। দেশ কোথায় যাচ্ছে, সমাজ কোথায় যাচ্ছে তা নিয়ে কোন ভাবনা ঐ মুহূর্তে অনামিকার মাথায় এলো না। ঘরে থাকলে, ফেসবুকে লেখার সময় এসব নিয়ে ভাবা যায়! এখন ও ভাবছে সম্পূর্ণ অন্য কথা। নিজের নিরাপত্তার কথা! এখন এই মাঝ পথে যদি সুপারভাইজার ওকে নেমে যেতে বলে, ও কি করবে?

লজ্জা, অপমান আর ভয়ে অনামিকা মাথা নীচু করে রইলো যেন সুপারভাইজারের সাথে চোখাচোখি না হয়! চোখাচোখি হলেই যদি সুপারভাইজার বলে, ” আপা, সামনেই একটা বাজার আছে, সেইখানে আপনেরে নামায় দেই, লোকাল বাস পাইয়া যাইবেন। লোকাল বাসে ওয়াজ চলেনা, মাথা ব্যথা সাইরা যাইবো আপনের”।

হাতব্যাগ হাতড়ে ইয়ারফোন বের করলো অনামিকা। মাথা নীচু রেখেই দুই কানে ইয়ারফোন গুঁজে দিল, এবং একসময় ঢাকা এসে পৌঁছালো।

** অনামিকা আজ আমাকে একটা মেসেজ পাঠিয়েছে। এই ঘটনা লিখে একেবারে শেষে লিখেছে, ” বুবু, আমরা হেরে গেছি। আমাদের আগের প্রজন্ম আমাদের কাছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ এনে দিয়েছিলেন, আমাদের প্রজন্ম এত ভার বইতে পারিনি। পরবর্তি প্রজন্মের জন্য আমরা কী রেখে যাচ্ছি!**

আমি অনামিকাকে কোন উত্তর দেইনি, কী-ইবা বলবো অনামিকাকে। অনামিকার বাসের ওয়াজে অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে গালিগালাজ করছে, দেশে্র ক্ষমতায় আছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি। ফেসবুকে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে নিয়ে যাচ্ছে তা স্ট্যাটাস লিখছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনকর্ম থেকে শুরু করে ব্যক্তি আচরণ নিয়েও যাচ্ছে তা স্ট্যাটাস দিচ্ছে। আইটি বিভাগে আছেন ডিজিটাল মন্ত্রী। কই, কিছুইতো হচ্ছেনা!

মন্ত্রী মিনিস্টাররাই যেখানে নীরব থাকেন, সেখানে অনামিকা জাহান সরব হয় কি করে?

তবুও বললাম, প্রতিবাদ যেখানে নিজের এবং পরিবারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে নীরব থেকো। শুধু তো বাস থেকে নামিয়ে দেয়া নয়, শারীরিক ক্ষতিও করতে পারে! কী দরকার যেচে বিপদ ডেকে নিয়ে আসা!

সামনাসামনি প্রতিবাদ করতে না পারা মানে পরাজয় নয়।

প্রতিবাদ অন্যভাবেও হতে পারে। নিজের মন, নিজের রুচি, নিজের শিক্ষা অনুযায়ী নিজের পরিবারের আগামীর সদস্যদের গড়ে তুলো। আগামীর সদস্যরাই পারবে পুরো সমাজকে আলোর পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে।

-সম্পাদিত